প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-একসময় দিল্লির বুক কাঁপিয়ে স্লোগান উঠেছিল, “দিল্লি চলো”। ত্রিপুরা, গোয়া, মেঘালয় থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে চার্টার্ড ফ্লাইটে উড়ে গিয়েছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা। লক্ষ্য একটাই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জাতীয় রাজনীতির প্রধান মুখ করে তোলা এবং দলকে সর্বভারতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু বাস্তব যে কতখানি নির্মম, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মমতার শিবির। নামেই যা ছিল ‘সর্বভারতীয়’, বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে যার এক ইঞ্চিও রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না—আজ সেই খোদ বাংলায় নিজের তৈরি করা দুর্গের মাটিতেই দল এখন খণ্ড-বিখণ্ড। প্রতীক চলে গিয়েছে, অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গের বুকে আদৌ কি এই দলের কোনও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অবশিষ্ট থাকবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কখনই প্রকৃত অর্থে সর্বভারতীয় দল হয়ে উঠতে পারেনি। একটি আঞ্চলিক দল যখন অন্য রাজ্যে পা বাড়ায়, তখন তার নিজস্ব কোনও আদর্শ বা জনভিত্তি লাগে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল কিছু দলছুট নেতা এবং টাকার জোরে ভিন রাজ্যে সংগঠন তৈরি করতে চেয়েছিলেন। গোয়া বা ত্রিপুরার মানুষ তাঁদের ‘বহিরাগত’ হিসেবেই দেখেছিল। ফলস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন অনেক আগেই তাদের জাতীয় দলের তকমা কেড়ে নিয়েছিল। আর আজ যখন আসল রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়েছে, তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে সেই ‘সর্বভারতীয়’ তকমা আসলে একটা রাজনৈতিক বুদবুদ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। রাজ্য স্তরের হেভিওয়েট নেতা থেকে শুরু করে জেলা ও বুথ স্তরের কর্মীরা দলে দলে দলবদল করছেন। তার ওপর নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বড় ধাক্কা খেয়েছে এই শিবির। দলের মূল প্রতীকটি এখন ‘ফ্রিজ’ বা স্তব্ধ। যে জোড়াফুল প্রতীক দেখে মানুষ ভোট দিত, সেটাই আজ আর তাঁদের হাতে নেই। রাজনীতির কারবারিদের মতে, প্রতীক চলে যাওয়া মানে একটি দলের পরিচয় হারিয়ে যাওয়া। এই অবস্থায় দল ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রীক দল বা ‘ওয়ান ওম্যান শো’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া সেখানে দ্বিতীয় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো নেতা তৈরি হতে দেওয়া হয়নি। আজ যখন তিনি নিজেই গৃহবন্দি বা হাউস অ্যারেস্টের অভিযোগ তুলছেন, তখন নিচুতলার কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। ফলে কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। নিচুতলার কর্মীরা হয় ঘরে বসে যাচ্ছেন, নয়তো বিজেপির শক্তিশালী বুথ পরিকাঠামোর সামনে আত্মসমর্পণ করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, এ রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে পুরোনো শাসক দল খুব দ্রুত বিলীন হয়ে যায়। যেভাবে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারানোর পর আজ বিধানসভায় শূন্য, ঠিক একই রূপরেখা এখন তৈরি হচ্ছে মমতার দলের জন্যও। কারণ, এই দলের উত্থান হয়েছিল তীব্র বাম-বিরোধী আবেগকে ভর করে। কিন্তু আজ যখন তাঁরা নিজেরাই বিরোধী আসনে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ, তখন আমজনতা আর তাঁদের বিকল্প ভাবছে না। তাছাড়া, কংগ্রেস বা অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে জোটের অঙ্কে বারবার পিছিয়ে পড়ায় দলের নিজস্ব ব্র্যান্ড ভ্যালুও এখন তলানিতে।
দিল্লির তখত জয় করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছিলেন, তা আজ তাঁর নিজের রাজ্যেই বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। ঘরের মাটি শক্ত না করে বাইরের আকাশ ছোঁয়ার এই রণকৌশলগত ভুলই আজ তাঁর দলকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নাম হারিয়ে, প্রতীক হারিয়ে এবং নিজের গড় হারিয়ে যে দল এখন খণ্ড-বিখণ্ড, তা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আগামী দিনে কেবল একটি সাইনবোর্ড বা ছোট উপদল হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি পুরোপুরি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে—তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।