প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট- নির্বাচনের নির্ঘণ্ট বেজে উঠতেই রাজ্য রাজনীতিতে মহাপ্রলয়। শাসক শিবিরের দুর্ভেদ্য দুর্গে এবার বড়সড় ফাটল ধরল। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের মত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলায় তৃণমূলের অন্দরে যে রক্তক্ষরণ শুরু হলো, তা ভোটের ময়দানে চরম অস্বস্তি তৈরি করল ঘাসফুল শিবিরের জন্য। আজ সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য দপ্তরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে পদ্ম পতাকা হাতে তুলে নিলেন নবগ্রামের দাপুটে বিদায়ী বিধায়ক কানাইচন্দ্র মণ্ডল। এই দলবদল কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়, বরং আস্ত একটি বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে নবগ্রাম আসনটি থেকে পুরনো চালের ওপর ভরসা না রেখে নতুন মুখ প্রণব চন্দ্র দাসকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এই সিদ্ধান্তই এখন বুমেরাং হয়ে ফিরল দলের কাছে। তিনবারের বিধায়ক হওয়া সত্ত্বেও টিকিট না পাওয়ায় কানাইবাবুর অনুগামীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। নিজের গড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তাঁকে ব্রাত্য করে রাখায় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর যে তিনি প্রবল ক্ষুব্ধ ছিলেন, তা আজ গেরুয়া শিবিরে যোগদানের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেল।

কানাইচন্দ্র মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণময়। ২০১১ ও ২০১৬ সালে বাম আমলের কঠিন লড়াইয়ের দিনেও তিনি সিপিএম-এর টিকিটে বিধানসভায় পৌঁছেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখান এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে পুনরায় বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। বাম জমানা থেকে শুরু করে তৃণমূল আমল—প্রতিবারই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মা এবং জনসংযোগ দলের প্রতীকের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে নবগ্রামের বুথ স্তরে তাঁর যে বিশাল অনুগামী বাহিনী রয়েছে, তারা এখন কোন দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে শাসক দলের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে এই যোগদান বিজেপির জন্য বড় জয়ের সমান। শুভেন্দুবাবু বারবারই দাবি করে আসছেন যে, তৃণমূলের অন্দরে টিকিট বণ্টন নিয়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আজকের এই ভাঙন সেই দাবিকেই জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করল। বিজেপির এই কৌশলী চালে নবগ্রাম তো বটেই, সংলগ্ন এলাকা গুলোতেও তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো নড়বড়ে হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বিদায়ী বিধায়ক যখন নির্বাচনের মুখে দল ছাড়েন, তখন সেই কেন্দ্রের কয়েক হাজার নিশ্চিত ভোটও তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে যায়, যা তৃণমূলের জন্য বিরাট উদ্বেগের কারণ।

তৃণমূলের একটি অংশ মনে করছে, নিয়োগ মামলার ছায়া বা শোকজের মতো বিষয়গুলো সামনে এনে পুরনো যোদ্ধাকে সরিয়ে দেওয়া হয়তো সঠিক কৌশলী চাল ছিল না। কারণ, যে নেতার হাত ধরে জেলা স্তরে সংগঠন মজবুত হয়েছিল, তাঁকে নির্বাচনের ঠিক মুখে প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া মানে নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারা। তৃণমূলের নিচু তলার কর্মীদের মধ্যেও এখন একটাই প্রশ্ন—ঘরের মানুষই যদি পরের ঘরে চলে যায়, তবে লড়াইটা কার ওপর ভরসা করে হবে?সার্বিকভাবে, এই দলবদল নবগ্রামের রাজনৈতিক জমিকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিল। এখন দেখার, তৃণমূল তাদের পুরনো গড় বাঁচাতে নতুন প্রার্থীর ম্যাজিকে ভরসা পায়, নাকি পুরনো সৈনিকের হাত ধরে সেখানে প্রথমবার পদ্ম ফোটে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, শুভেন্দু-শমীকের এই মাস্টারস্ট্রোকে তৃণমূল এখন আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা।