প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর ভোটের ডঙ্কা বাজতেই উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়া এখন সরগরম। তবে এবার আর বাইরের লড়াই নয়, ঘাসফুল শিবিরের অন্দরেই শুরু হয়েছে ‘মহাভারত’। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় ছাত্রনেতা তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের নাম আসতেই যা শুরু হয়েছে, তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারা’। একদিকে ঘরের ছেলে সুনীল সিংয়ের গেরুয়া বসন পরার তীব্র ইচ্ছা, আর অন্যদিকে প্রবীণ নেত্রী মঞ্জু বসুর কান্নায় ভেজা বিদায়— সব মিলিয়ে নোয়াপাড়ায় তৃণমূলের ‘নৌকা’ এখন মাঝদরিয়ায় টালমাটাল।

নোয়াপাড়ার প্রাক্তন বিধায়ক সুনীল সিং বরাবরই দাপুটে নেতা। অর্জুন সিংয়ের এই আত্মীয় ২০১৯ সালে একবার পদ্ম-শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন। ২০২২-এ ঘাসফুলে ফিরলেও এবার টিকিট বণ্টনের ‘ম্যাজিক’ দেখে তিনি থ। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করায় সুনীলবাবুর মেজাজ এখন সপ্তমে। তাঁর স্পষ্ট কথা, “যাঁরা রাজনীতির ময়দানে ঘাম ঝরাননি, হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ে টিকিট পেলেন, তাঁদের দিয়ে নোয়াপাড়া জেতা সম্ভব নয়।” রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, সুনীলবাবু নাকি ইতিমধ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর ‘গুড বুক’-এ নাম তুলে ফেলেছেন। তাঁর অনুগামীরা বলছেন, “দাদা শুধু সময়ের অপেক্ষা করছেন, পদ্ম ফুটবে নোয়াপাড়াতেই।”

নোয়াপাড়ার রাজনীতির ‘লক্ষ্মী’ হিসেবে পরিচিত মঞ্জু বসু। দীর্ঘ ২৫ বছরের রাজনৈতিক জীবন শেষে এবার তিনি ব্রাত্য। তৃণাঙ্কুরকে জায়গা দিতে গিয়ে তাঁকে যেভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে, তাতে মঞ্জু দেবীর চোখের জল বাঁধ মানছে না। তবে যাওয়ার আগে তিনি যে ‘বোমাটি’ ফাটিয়েছেন, তাতে তৃণমূলের ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’র বেলুন একেবারে ফুটো। তিনি প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন, টিকিট পেতে গেলে নাকি ‘লেনদেন’ আর ‘তোলাবাজি’তে পারদর্শী হতে হয়! মঞ্জু দেবীর দাবি, “আমি তোলা তুলতে পারি না, তাই হয়তো আমার আর প্রয়োজন নেই।” তাঁর এই মন্তব্য এখন পাড়ায় পাড়ায় চায়ের আড্ডায় আলোচনার বিষয়— “তবে কি তৃণমূলের টিকিট এখন নিলামে উঠছে?”

ছাত্র রাজনীতিতে তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য পরিচিত মুখ হলেও নোয়াপাড়ার কঠিন জমিতে তিনি একেবারেই ‘পরবাসী’। একদিকে সুনীল সিংয়ের হুঙ্কার, অন্যদিকে মঞ্জু বসুর আশীর্বাদহীন বিদায়— এই জোড়া ফলার সামনে বেচারা তৃণাঙ্কুর এখন দিশেহারা। এমনকি খোদ ব্যারাকপুরের ‘ভীষণ’ নেতা অর্জুন সিংও এই প্রার্থী বাছাই নিয়ে খুব একটা আহ্লাদিত নন। ব্যঙ্গ করে স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, “ছাত্র রাজনীতি আর ভোটের লড়াই এক নয় খোকাবাবু, এখানে মাটির গন্ধ লাগে, যা আপনার মধ্যে নেই!”

নোয়াপাড়ার এই চরম অন্তর্কলহ দেখে বিজেপি শিবির এখন হাত কামড়াচ্ছে না, বরং মুচকি হাসছে। কারণ, প্রতিপক্ষের অন্দরে যখন এমন ‘খুনোখুনি’ চলে, তখন মাঠ ফাঁকা পাওয়াটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা। সুনীল সিং যদি সত্যিই শেষ মুহূর্তে পদ্ম-পতাকা ধরেন, তবে তৃণমূলের এই ‘নতুন চাল’ যে বুমেরাং হবে, তা বলাই বাহুল্য। তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্ব ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামলেও, তাতে কতটা কাজ হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। যেখানে বিদায়ী বিধায়িকা কেঁদে বিদায় নেন আর প্রাক্তন বিধায়ক বিপক্ষ শিবিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে থাকেন, সেখানে ‘অল ইজ ওয়েল’ বলাটা কি আর সাজে?

২০২৬-এর লড়াইয়ে নোয়াপাড়া এখন তৃণমূলের জন্য গলার কাঁটা। সুনীল সিংয়ের ‘বেসুরো’ মেজাজ আর মঞ্জু বসুর ‘অভিমানে’র ফল কি শেষ পর্যন্ত পদ্ম শিবিরকে উপহার হিসেবে দেওয়া হবে? উত্তর লুকিয়ে আছে সুনীল সিংয়ের আগামী কয়েকদিনের পদক্ষেপে। আপাতত নোয়াপাড়াবাসী দেখছেন এক অদ্ভুত সার্কাস, যেখানে ‘খেল খতম’ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে বিরোধীরা।