প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে হওয়া এক বিরাট আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। দুর্গাপূজার ইউনেস্কো (UNESCO) হেরিটেজ স্বীকৃতিকে হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারণার লিখিত অভিযোগ দায়ের হলো রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিদায়ী বিধায়ক ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। কলকাতার বউবাজার থানায় এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক সমালোচক এবং বিরোধী শিবিরের তোপের মুখে পড়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী।
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (ICH) স্বীকৃতি পাওয়ার পরই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি চক্র। অভিযোগ, ইউনেস্কোর কোনো অনুমতি ছাড়াই তাদের নাম ও লোগো বেআইনিভাবে ব্যবহার করে ব্যবসা ফাঁদেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবকে বিশ্বমঞ্চে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করার এই অপচেষ্টা অত্যন্ত লজ্জাজনক। প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেনের সভাপতিত্বে ‘মাসআার্ট’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (NGO) গড়ে তোলা হয়। এই সংস্থার আড়ালেই মূলত পুজো পরিক্রমার নামে টিকিট বিক্রির চক্রটি চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ। বিরোধীদের দাবি, এনজিও-র আড়ালে পারিবারিক স্বার্থ চরিতার্থ করার এই সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের অভ্যাসেরই ফসল।
আন্তর্জাতিক এবং ভিনরাজ্যের পর্যটকদের বোকা বানিয়ে মণ্ডপ পরিদর্শনের (Pre-Puja Preview) জন্য মাথা পিছু প্রায় ৪,০০০ টাকা মূল্যের প্রিভিউ টিকিট এবং ডোনার পাস বিক্রি করা হয়। ইউনেস্কোর নাম থাকায় বহু মানুষ বিশ্বস্ততার খাতিরে এই চড়া দামের টিকিট কেনেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনেস্কোর মতো একটি আন্তর্জাতিক সম্মানকে ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষের পকেট কেটেছে, তারা কেবল আর্থিক জালিয়াতিই করেনি, আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার সংস্কৃতি ও ভাবমূর্তির অপূরণীয় ক্ষতি করেছে।
একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার প্রতিনিধি জয়দীপ মুখোপাধ্যায় এই সংগঠিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বউবাজার থানায় ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় এফআইআর (FIR) দায়ের করেছেন। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন-সহ মোট ৫ জনকে। অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (DGP)-র কাছেও। অভিযোগের কপি সামনে আসতেই বিরোধীরা সুর চড়িয়েছেন। বিরোধী শিবিরের নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া দলটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি লুকিয়ে ছিল, এই পুজো-কেলেঙ্কারি তার আরও একটি অকাট্য প্রমাণ। ক্ষমতা চলে গেলেও দুর্নীতির মানসিকতা যে যায়নি, তা এই ঘটনা থেকেই পরিষ্কার। স্বয়ং মা দুর্গার নাম ভাঙিয়ে টাকা তোলার এই পারিবারিক কেলেঙ্কারি নিয়ে জনমানসেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
দায় এড়াতে চিরাচরিত ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের’ তত্ত্ববরাবরের মতো এবারও সমস্ত অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” এবং “ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ইন্দ্রনীল সেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, যেকোনো কেলেঙ্কারি সামনে এলেই অবলীলায় সেটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে ধামাচাপা দেওয়া ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের পুরোনো কৌশল। কিন্তু এবার আন্তর্জাতিক স্তরের জালিয়াতির অভিযোগ ওঠায় পুলিশ আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবি, ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম ব্যবহার করে যারা বাংলার সংস্কৃতির মুখে চুনকালি দিল, তাদের যেন রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অবিলম্বে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।