প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
রাজ্য রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া। আর এই সংবেদনশীল ইস্যুটিকে হাতিয়ার করেই বৃহস্পতিবার পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বরের সভা থেকে ফের একবার ‘ভয়ের রাজনীতি’ শুরু করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক লড়াইকে তিনি টেনে নিয়ে গেলেন মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে। নিজেকে ও নিজের দলকে ‘পাণ্ডব’ এবং প্রধান বিরোধী শক্তিকে ‘কৌরব’ বলে দেগে দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে মেরুকরণের তাসই খেললেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, গত ১৫ বছরে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি আর ধুঁকতে থাকা শিল্পের জ্বালায় সাধারণ মানুষ যখন অতিষ্ঠ, তখন কেন ধর্মের দোহাই দিয়ে এই ‘পাণ্ডব’ সাজার মরিয়া চেষ্টা?

এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে দাবি করেন, বিজেপি নাকি আগে থেকেই ১ কোটি ২০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছে এবং কমিশন এখন সেটাই কার্যকর করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার এই দাবি আসলে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করার সুপরিকল্পিত চাল। তথ্য বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সম্পূর্ণ স্বশাসিত সংস্থা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপের আইনত সুযোগ নেই। কমিশনের রুটিন মাফিক স্বচ্ছ করার প্রক্রিয়াকে ‘বিজেপির ষড়যন্ত্র’ বলে চালিয়ে দিয়ে জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো কি আদৌ দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়? নাকি ক্ষমতা হারানোর ভয়েই এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে?

পাণ্ডবেশ্বরের মাটিতে দাঁড়িয়ে নেত্রী দাবি করেন, পশ্চিম বর্ধমান জেলা তৈরি থেকে শুরু করে অন্ডাল বিমানবন্দর বা কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়—সবই তাঁর জাদুমন্ত্রে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা কি তাই? আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল আজ ধুঁকছে। একের পর এক বন্ধ কারখানা আর শ্রমিকদের হাহাকারের মাঝে দাঁড়িয়ে এই উন্নয়নের আস্ফালন আসলে ‘উন্নয়নের ফানুস’ ওড়ানো ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছে বিরোধী শিবির। শিল্পের বদলে এই জেলায় কয়লা পাচার আর সিন্ডিকেট রাজের যে অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে, তার কোনো উত্তর কি নেত্রীর কাছে আছে?

রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ে সরব হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। ৪০০ টাকার গ্যাস ১১০০ টাকা হওয়ার পরিসংখ্যান দিয়েছেন। কিন্তু রাজ্য সরকার পেট্রোল-ডিজেলের ওপর যে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট বা সেস আদায় করে, তা কমিয়ে কেন সাধারণ মানুষকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দিচ্ছে না, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলায়নি। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের স্টিকার বদলে দিয়ে নিজের নামে চালানোর যে সংস্কৃতি বাংলায় চলছে, তা নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি নেতৃত্ব।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাণ্ডব’ বনাম ‘কৌরব’ তত্ত্ব আসলে তাঁর প্রশাসনের ব্যর্থতা আড়ালের এক দুর্বল প্রচেষ্টা। যে জেলায় নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে মাফিয়া রাজের দাপট প্রবল, সেখানে নিজেকে ‘পাণ্ডব’ দাবি করা হাস্যকর বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। মানুষ এখন আর শুধু পৌরাণিক রূপকথা বা আবেগী ভাষণে ভুলতে রাজি নয়, তারা কাজের খতিয়ান চায়। আর সেই হিসাব দিতে না পেরেই কি শেষমেশ সেই পুরনো ‘ভয়ের রাজনীতি’ আর ‘ধর্মীয় তাস’ খেলতে হচ্ছে তৃণমূল নেত্রীকে? পাণ্ডবেশ্বরের এই জনসভা কি আদৌ তৃণমূলের পালের হাওয়া ফেরাতে পারবে, তা সময়ই বলবে।