প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বসন্তের তপ্ত দুপুরে বাংলার রাজনীতির পারদ এখন টগবগ করে ফুটছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি, আর অন্যদিকে শাসক-বিরোধী শিবিরের বাগযুদ্ধ। বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হতেই শুরু হয়েছে প্রশাসনিক ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’। আর সেই চেয়ার বদল ঘিরেই এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বের জবাবে পাল্টা ‘হারের আতঙ্ক’ কটাক্ষ ছুড়ে দিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এদিন রাজ্য বিজেপির সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে বিঁধলেন, তাতে রাজনৈতিক মহলে রীতিমত শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আধিকারিকদের বদলি নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, কমিশন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর প্রশাসনের দক্ষ অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামের বিডিও-কে ভবানীপুরে নিয়ে আসা নিয়ে তিনি সরাসরি তোপ দাগেন। তাঁর ইঙ্গিত ছিল, এই অফিসার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘ঘনিষ্ঠ’ বা তাঁর ভাষায় ‘গদ্দারের নিজের লোক’। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য যেন বারুদে অগ্নিসংযোগের কাজ করে। নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিচরণক্ষেত্র ভবানীপুরে কেন বাইরের লোক আনা হচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণের জবাব দিতে বিশেষ সময় নেননি শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে পাশে বসিয়ে তিনি যেন একাই একশো। অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধারালো ভাষায় শুভেন্দু বলেন, “এই ধরনের কথার উত্তর দেওয়া মুশকিল।” তাঁর দাবি, এই বদলি কোনও রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা নয়, বরং স্বয়ং নির্বাচন কমিশনের আইনি প্রক্রিয়া। তিনি তথ্য দিয়ে মনে করিয়ে দেন যে, যাঁদের পরিবর্তন করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশ অফিসারই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারে কাজ করেছেন ২০১১ সালের পর থেকে। অর্থাৎ, যাঁদের মুখ্যমন্ত্রী ‘পর’ ভাবছেন, তাঁরা আসলে তাঁরই তৈরি করা প্রশাসনের অংশ।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের সবথেকে রসালো এবং তীক্ষ্ণ অংশটি ছিল তাঁর হুঁশিয়ারি। তিনি কাব্যিক ঢঙে মুখ্যমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেন, “কাচের ঘরে বসে ঢিল ছুড়বেন না।” তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী যদি এই বদলি নিয়ে আক্রমণ বন্ধ না করেন, তবে তিনি এমন এক ‘লিস্ট’ বা তালিকা প্রকাশ করবেন যা প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। শুভেন্দুর কথায়, মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ে (CMO) ওএসডি হিসেবে কাজ করা অফিসাররাই এখন অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (DEO) হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তবে কি নিজের ঘরের লোকরাই এখন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে?
বিরোধী দলনেতার নিশানায় ছিল মমতার ‘খাসতালুক’ ভবানীপুর। তিনি রীতিমতো রসিকতা করে প্রশ্ন তোলেন, মুখ্যমন্ত্রী যেখানে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছেন, যেটিকে নিজের বাড়ি ও নিজের জায়গা বলে গর্ব করেন, সেখানে একজন অফিসারের বদলিতে এত ‘কম্পন’ কেন? শুভেন্দুর সোজা সাপটা দাবি, এই অস্থিরতা আসলে ‘হারের আতঙ্ক’। তাঁর মতে, ভবানীপুরের মাটিতে এখন পদ্মফুলের হাওয়া বইছে এবং পরাজয় নিশ্চিত জেনেই মুখ্যমন্ত্রী অফিসারদের অজুহাত খাড়া করছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সুর চড়িয়ে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারবেন। বিজেপি জিতবে। ভবানীপুর এখন বিজেপির জায়গা।”
বাংলার এই রাজনৈতিক দাবা খেলায় প্রতি পদক্ষেপে বদলাচ্ছে সমীকরণ। একদিকে দিদির ‘অভিমানী’ প্রতিবাদ, আর অন্যদিকে শুভেন্দুর ‘তথ্যনিষ্ঠ’ আক্রমণ— দুইয়ে মিলে ভোট উৎসবের আগেই যুদ্ধং দেহি মেজাজ। শুভেন্দুর এই ‘ধুয়ে দেওয়া’ আক্রমণ এখন বাংলার অলিতে-গলিতে চর্চার বিষয়। তবে শেষ হাসি কে হাসবে, তা বলবে আগামী ৪ ঠা মে। আপাতত, অফিসারদের এই ‘ঘর বদল’ আর রাজনীতিকদের ‘বাক্যবাণ’—এই দুইয়ের মিশেলে সরগরম তিলোত্তমার রাজপথ।