প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং আবেগঘন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যে পানিহাটি একসময় শিল্প আর সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে গত কয়েক দশকে প্রতিবাদের যে সুর স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, তাকে পুনরায় জাগ্রত করতে ময়দানে নামলেন খোদ ‘তিলোত্তমার’ মা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাঁর কাছে এই লড়াই কোনো সাধারণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এক বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জননী হৃদয়ের হাহাকার থেকে জন্ম নেওয়া এক মহাযুদ্ধ।

মনোনয়ন পাওয়ার ঠিক পরেই তাঁর চোখে-মুখে ধরা পড়েছে এক দৃঢ় সংকল্প।সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “এটাও আমাদের কাছে একটা জয় বলা যেতে পারে। আমি যদি জিততে পারি, তবে তা হবে পানিহাটির শোষিত-বঞ্চিত মানুষের জয়।” তাঁর মতে, বর্তমান জমানায় মানুষ প্রতিবাদ করতেই প্রায় ভুলে গিয়েছে। ভয় আর ত্রাসের এক বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রোধ করা হচ্ছে। তিনি সেই স্তব্ধ হয়ে যাওয়া কণ্ঠকে ভাষা দিতে চান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই প্রার্থীপদ কোনো দলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এক সামাজিক আন্দোলনের প্রতীকে।

বাংলার বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় নারী নিরাপত্তা যে তলানিতে ঠেকেছে, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি না নিলেও তাঁর পূর্ববর্তী নানা মন্তব্য এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিলোত্তমার মা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “কেন আমাদের মেয়েরা নিরাপদ নয়? এখানকার মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে মহিলারা রাতে রাস্তায় বেরোবেন না, কিন্তু কেন? আমরা কি স্বাধীন দেশে বাস করছি না?” তাঁর এই লড়াই মূলত নারী-পুরুষের সমান অধিকারের লড়াই। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সুরক্ষা দেওয়া সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য, যা বর্তমান শাসকরা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। মায়েদের হয়ে, বোনদের হয়ে তিনি বিধানসভায় সরব হতে চান, যাতে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়। তাঁর এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক মহলে শাসক দলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিলোত্তমার মা কেবল ব্যক্তিগত শোকের বৃত্তে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি আঙুল তুলেছেন রাজ্যের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দিকে। আর জি কর হাসপাতালের একের পর এক নক্কারজনক ঘটনা এবং দুর্নীতির পাহাড় যেভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে সাধারণ মানুষের আস্থা আজ শূন্য। সম্প্রতি আর জি কর হাসপাতালে লিফটে সাতজন রোগীর আত্মীয় আটকে পড়ার মতো ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য দপ্তরের যে বেহাল দশা আপনারা দেখছেন, তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে। একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছেন অব্যবস্থায়, আর সরকার নির্বিকার।” তাঁর লক্ষ্য বিধানসভায় পৌঁছে এই জরাজীর্ণ ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করা।

পানিহাটি কেন্দ্রে তাঁর মূল লড়াই তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা মনে করছেন, একদিকে যেখানে প্রশাসনিক শক্তি, অর্থবল আর পুরনো রাজনৈতিক ছক রয়েছে, অন্যদিকে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক শোকাতুর অথচ তেজস্বী মা। এই লড়াই এখন আর কেবল বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়, বরং এই লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সাধারণ জনতা বনাম অপশাসন’।

বিজেপি শিবিরের দাবি, পানিহাটির সাধারণ মানুষ তিলোত্তমার মায়ের মধ্যে দিয়ে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। পানিহাটির অলিগলিতে এখন একটাই গুঞ্জন— “ভয় নয়, এবার হবে জয়।” শাসকের দুর্ভেদ্য দুর্গে এই প্রতিবাদের মশাল কতটা ভাঙন ধরাতে পারে, তার উত্তর দেবে ২০২৬-এর ব্যালট বাক্স। তবে প্রচারের শুরুতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ন্যায়ের দাবিতে তিনি এক চুলও জমি ছাড়তে রাজি নন।