প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজ্যের গ্রামীণ স্তরে প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং জনপরিষেবা সচল রাখতে এক অভাবনীয় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভোটাভুটির পর বিপুল জনসমর্থনে পাস হয়ে গেল বহু চর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬’। এই নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধানদের একক আর্থিক ক্ষমতা কার্যত খর্ব করা হলো। এখন থেকে পঞ্চায়েতের টাকা খরচ বা লেনদেনের ক্ষেত্রে সরকারি আমলা তথা এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টের (Executive Assistant) সই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিধানসভায় এই বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৬৯টি এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র ১৩টি।

এত দিন মূল পঞ্চায়েত আইনের নিয়ম অনুযায়ী গ্রাম পঞ্চায়েতের তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার মূল ক্ষমতা বা আদেশে একক অধিকার থাকত প্রধানদের। নতুন বিলে বলা হয়েছে, এখন থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের সব আদেশে এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টের স্বাক্ষর সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এমনকি পঞ্চায়েতের যেকোনো চেকে এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং পঞ্চায়েত সচিবের (Secretary) যৌথ স্বাক্ষর ছাড়া কোনো টাকা লেনদেন করা যাবে না। যদি কোনো গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান এবং উপপ্রধান টানা ১৫ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকেন এবং নির্বাচিত কোনো সদস্য দায়িত্ব নিতে রাজি না হন, তবে জনপরিষেবা সচল রাখতে সরকার সেখানে একজন এক্সটেনশন অফিসার বা ঊর্ধ্বতন কোনো আধিকারিককে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে। প্রধান ও উপপ্রধানের অনুপস্থিতির জেরে যদি টানা দুই মাস পঞ্চায়েতের কোনো সাধারণ সভা বা বৈঠক না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বিডিও-র (BDO) অনুমতি নিয়ে পঞ্চায়েত সচিব নিজেই বৈঠক ডাকতে পারবেন।

বিলটি পেশ করার সময় রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ জানান, রাজ্যের বহু গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানরা অনুপস্থিত থাকায় বা বিভিন্ন কারণে উন্নয়নের কাজ এবং কর্মীদের মজুরি দেওয়ার প্রক্রিয়া আটকে যাচ্ছিল। তিনি স্পষ্ট বলেন, “একটি মানুষের অনুপস্থিতির জন্য গ্রামীণ জনমানুষের কাজ আটকে থাকবে, তা হতে পারে না। কাটমানি খাওয়া বন্ধ করতে এবং গ্রামীণ প্রশাসনে ১০০ শতাংশ স্বচ্ছতা ও গতি আনতেই এই কঠোর আইন আনা হয়েছে।” যেহেতু সরকারি আমলারা সরাসরি রাজ্য প্রশাসনের অধীনে চাকরি করেন, তাই তাঁদের আর্থিক জবাবদিহিতার আওতায় এনে এই স্থবিরতা দূর করা সম্ভব।

বিলটির বিরোধিতা করে বিধানসভায় ভোটাভুটির দাবি জানিয়েছিলেন তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিরোধীদের একাংশের দাবি, এই সংশোধনী বিল পাসের ফলে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কমিয়ে তা সম্পূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের হাতে সঁপে দেওয়া হলো। তাঁদের মতে, আমলাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনের মূল আদর্শকে দুর্বল করতে পারে। যদিও সরকার পক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রধানদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকারে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি, কেবল আর্থিক গতি সচল রাখতেই এই পরিবর্তন।