প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজ্যে ক্ষমতার ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটেছে। আর নতুন জমানার চাকা ঘুরতেই যে রাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় সংস্কারের চাবুক পড়বে— তা বলাই বাহুল্য! সোমবার, ৮ জুন ২০২৬ তারিখে নবান্নের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তরফ থেকে জারি করা এক নজিরবিহীন নির্দেশিকায় সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।লোকসভা হোক বা বিধানসভা— বিগত নির্বাচনগুলির সময় যাদের বিরুদ্ধে বারবার পক্ষপাতিত্বের ভুরিভুরি অভিযোগ উঠেছিল, এবার সেই পুলিশ প্রশাসনের খোলনলচে এক ধাক্কায় বদলে দিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকার।
একযোগে ১৭৯ জন উচ্চপদস্থ আইপিএস (IPS) ও ডব্লুবিপিএস (WBPS) আধিকারিকের এই ব্যাপক বদলি ও পদোন্নতির ঘটনাকে নিছক ‘রুটিন বদলি’ বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ রাজনৈতিক মহল। ওয়াকিবহাল মহলের স্পষ্ট মত, একে পুলিশ মহলে আসলে এক বড়সড় ‘শুদ্ধিকরণ’ এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার রাশ শক্ত হাতে ধরার জন্য নতুন জমানার এক কড়া বার্তা।সবচেয়ে বড় রদবদল চোখে পড়েছে রাজ্যের ১২টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারদের (SP) ক্ষেত্রে। ডায়মন্ড হারবার, বীরভূম, বারাসাত থেকে শুরু করে বাঁকুড়া— বিগত দিনে বহুচর্চিত এবং রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত সব জেলার পুলিশ প্রধানদের একযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন শাসক শিবিরের সবচেয়ে সুরক্ষিত গড় বলে পরিচিত এই অঞ্চলের পুলিশ সুপার ঈশানী পালকে একপ্রকার আকস্মিকভাবেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে কলকাতা পুলিশের ডিসি (সাউথ-ওয়েস্ট) পদে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জায়গায় ডায়মন্ড হারবারের নতুন পুলিশ প্রধানের গুরুদায়িত্বে আসছেন চন্দ্রশেখর বর্ধন। যেখানে একদা কেষ্ট-সাম্রাজ্যের সমান্তরাল দাপট চলত, সেখানকার এসপি সূর্য প্রতাপ যাদবকে সরিয়ে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিকের জয়েন্ট সিপি করা হয়েছে। বীরভূমের নতুন এসপি পদে আসছেন বিদিত রাজ ভুন্ডেশ। বারাসাতের এসপি পুষ্পাকে বদলি করা হয়েছে পূর্ব বর্ধমানে, এবং তাঁর জায়গায় বারাসাতের হাল ধরছেন জে. মার্সি। অন্যদিকে পুরুলিয়ার এসপি বৈভব তিওয়ারি আসছেন কলকাতা পুলিশে, তাঁর জায়গায় নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কুমার সানি রাজকে।বাঁকুড়ার এসপি সৌমিত ভট্টাচার্যকে পাঠানো হয়েছে মালদহ STF-এর এসপি পদে। তাঁর জায়গায় বাঁকুড়ার নতুন পুলিশ সুপার হচ্ছেন ভি. সি. সতীশ পাসুমার্তি।জলপাইগুড়ির বিদায়ী এসপি অমরনাথ কে.-কে উত্তরবঙ্গের ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ) পদে বদলি করে জলপাইগুড়ির নতুন এসপি করা হয়েছে সুজাতা কুমারী বীণাপাণিকে।
শুধু জেলাই নয়, কলকাতার লালবাজার এবং রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগেও (IB) হয়েছে ব্যাপক রদবদল। দীর্ঘদিন ধরে মূল স্রোতের বাইরে থাকা বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বে থাকা বেশ কিছু দক্ষ আধিকারিককে সামনের সারিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিধাননগরের প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মাকে এবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (IB) আইজিপি (IGP) করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের নতুন অতিরিক্ত কমিশনার (Crime) পদে আসছেন কুণাল আগরওয়াল। অন্যদিকে, শিলিগুড়ির নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন সৈয়দ ওয়াকার রাজা। রূপেশ কুমারকে কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপি (ট্রাফিক) থেকে সরিয়ে রাজ্য এসটিএফ-এর ডিআইজি (DIG) করা হয়েছে।
সাংবিধানিক নিয়ম মোতাবেক, যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত নতুন সরকার তার প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে, জনস্বার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ আধিকারিকদের বদলি বা পদোন্নতি করার পূর্ণ এক্তিয়ার ও অধিকার রাখে। নবান্নের এই নির্দেশিকাটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক স্তরে, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বিধি মেনেই পেশ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বতন জমানার ‘ঘনিষ্ঠ’ তকমা সাঁটা পুলিশ কর্তাদের ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে, নিরপেক্ষ ও কড়া ধাঁচের অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোই এই মেগা রদবদলের মূল উদ্দেশ্য। এখন দেখার, নতুন সরকারের এই কড়া পুলিশি বিন্যাসে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য কতটা আশাব্যঞ্জক হয়ে ওঠে।