প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-নবান্ন হাতছাড়া হওয়ার পর এবার কি তৃণমূলের শেষ শক্তিশালী দুর্গ কলকাতা পুরসভাতেও (KMC) তাসের ঘরের মতো ফাটল ধরতে শুরু করল? আজ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে আয়োজিত কাউন্সিলরদের এক ‘জরুরি’ বৈঠককে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতিতে যে তীব্র কম্পন শুরু হয়েছে, তা আর গোপন রাখা যাচ্ছে না। দলীয় সূত্রে খবর, চরম বিপদের দিনে আমন্ত্রিত ১৩৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ২৬ জন কাউন্সিলরই আজকের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে গরহাজির ছিলেন। রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের প্রশ্ন— ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দল দূরে সরতেই কি তবে কলকাতা পুরসভার এই একঝাঁক কাউন্সিলর নিজেদের দূরত্ব বাড়াতে শুরু করলেন?

কলকাতা পুরসভার ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন এবং অস্বস্তিকর দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক সম্পত্তিতে একের পর এক আইনি নোটিস পাঠানোকে কেন্দ্র করে অন্দরের সংঘাত চরমে উঠেছিল। এরপরই গতকাল হঠাৎ কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বাতিল করে দেওয়া হয় পুরসভার মাসিক অধিবেশন।আজকের পরিস্থিতি আরও বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে যখন তৃণমূলের কাউন্সিলররা পুরভবনে এসে দেখেন মূল অধিবেশন কক্ষটি স্রেফ ‘তালাবন্ধ’ অবস্থায় পড়ে রয়েছে! রাজ্যের প্রশাসনিক পটপরিবর্তনের পর আমলাতন্ত্র যে এখন আর পুরবোর্ডের নির্দেশে চলছে না, এই তালাবন্ধ ঘর তারই জ্বলন্ত প্রমাণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে, পুরসভার ঐতিহ্যকে একপ্রকার লঘু করে ‘কাউন্সিলরস ক্লাব রুমে’ একটি বিকল্প ও প্রতীকী সভা করতে বাধ্য হন ফিরহাদ হাকিম ও মালা রায়রা। আর এই চরম হড়পা বানের মতো পরিস্থিতি সামাল দিতেই তড়িঘড়ি কালীঘাটে কাউন্সিলরদের তলব করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেখানেও ২৬ জনের গরহাজির থাকাটা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অস্বস্তি যে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল শিবিরের অন্দরে যে এক ধরণের মানসিক ধস নেমেছে, এই অনুপস্থিতি তারই বড় প্রমাণ। অনুপস্থিতদের তালিকায় তারক সিং ও দেবালিনা বিশ্বাসের মতো বেশ কিছু পরিচিত নামও ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোটের পর থেকেই অনেক কাউন্সিলর নিয়মিত পুরভবনে আসছেন না বলেও খবর। রাজনৈতিক মহলের অন্দরে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে— এই ২৬ জন কাউন্সিলরের অনুপস্থিতি কি কেবলই কোনো ব্যক্তিগত কারণ, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ইঙ্গিত?

রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর থেকেই কলকাতা পুরসভাকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে কোমর বেঁধে চেপে ধরেছে বিজেপি শিবির। বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের দাবি, অনুপস্থিত কাউন্সিলরদের প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও অনেক বেশি এবং আগামী দিনে এই ফাটল আরও চওড়া হবে। ২০২৬ সালের শেষের দিকেই কলকাতা পুরসভার বর্তমান বোর্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার আগেই যেভাবে পুর প্রশাসনের রাশ হাতছাড়া হচ্ছে এবং খোদ নেত্রীর ডাকা বৈঠকেই একঝাঁক কাউন্সিলর ‘অদৃশ্য’ থাকছেন, তাতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে— আগামী দিনে কলকাতা পুরবোর্ড আইনিভাবে টিকে থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে তার আয়ু কতটা, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।