প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভানেত্রীর পদ থেকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের আচমকা ইস্তফার নেপথ্যে উঠে এল চরম অভিমান এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিতর্কিত ফোন কল। রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চললেও, অবশেষে সংবাদমাধ্যমের একাংশের কাছে মুখ খুলে নিজের মনের গভীর ক্ষোভ ও যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করলেন বিদায়ী সভানেত্রী। চন্দ্রিমা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দলনেত্রীর একটি মাত্র প্রশ্ন তাঁর দীর্ঘদিনের সততা ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
ঘটনার মূল যোগসূত্র রয়েছে গতকাল অর্থাৎ শুক্রবার মেট্রোপলিটান এলাকায় অবস্থিত তৃণমূল ভবনের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। গতকাল ওই দলীয় ভবনটির দখল নেওয়া বা তার রাশ নিজেদের হাতে রাখাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল শিবিরের অন্দরে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। ঠিক সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য নিজেই তাঁর অফিসে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময়েই কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক সেখানে আসেন। বিধায়করা চলে যাওয়ার পরপরই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের ফোনে সরাসরি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল আসে। চন্দ্রিমার দাবি, ফোনে ‘দিদি’ তাঁকে অত্যন্ত সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, “তুমি ওদের হাতে ভবন তুলে দিলে?” দলনেত্রীর মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ হয়ে যান চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সেই মুহূর্তের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, “এই কথাটা শুনে আমি ভীষণ কষ্ট পাই। আমি দিদিকে পালটা বলি, দিদি আপনি আমাকে এই কথা বলতে পারলেন?” তাঁর সংযোজন, দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি হয়তো অনেক সময় অনেকের প্রতি কঠোর হয়েছেন, কিন্তু দলের প্রতি তাঁর বিশ্বস্ততা নিয়ে কোনোদিন কেউ আঙুল তুলতে পারেনি। আজ যখন সুপ্রিমো নিজেই তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন আর পদে থাকার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি তিনি।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের এই ইস্তফা আকস্মিক মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে গত কয়েক মাসের এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দমদম উত্তর কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন চন্দ্রিমা। নির্বাচনে তৃণমূলের সামগ্রিক বিপর্যয়ের পর দলের অন্দরে যখন ব্যাপক রদবদল শুরু হয়, তখন প্রবীণ নেতা সুব্রত বক্সীর জায়গায় গত ৩ জুন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই গতকালকের ভবনের দখল ঘিরে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস দলের ভেতরের গভীর ফাটলকে স্পষ্ট করে দিল।ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সম্প্রতি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরের উত্থান এবং একাধিক নেতার দলত্যাগের আবহে তৃণমূলের অন্দরে এক চরম সংশয় তৈরি হয়েছে। দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীদের একাংশের কোণঠাসা হওয়া এবং ‘নব তৃণমূল’ শিবিরের ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে দলের অন্দরে যে টানাপোড়েন চলছিল, চন্দ্রিমার এই ইস্তফা তারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত, চন্দ্রিমার পুত্র সৌরভ ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ায় চন্দ্রিমার ওপর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের চাপ ও সন্দেহ দুই-ই বাড়ছিল। গতকাল নিজের অফিসে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, তাতেই তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে।
অত্যন্ত বেদনাহত মন নিয়ে শুধু রাজ্য সভাপতির পদই নয়, দলের সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের স্বাক্ষরকারী (সিগনেটরি) ক্ষমতা-সহ যাবতীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব একঝটকায় ত্যাগ করেছেন চন্দ্রিমা। একই সঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই চরম অপমানের পর আপাতত কালীঘাটে গিয়ে কোনো দলীয় বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো মানসিকতা বা পরিকল্পনা তাঁর নেই। এক মাসের মাথায় দলনেত্রীর সঙ্গে এই সংঘাত তৃণমূলের অন্দরের ফাটলকে আরও একবার প্রকাশ্যে এনে দিল। চন্দ্রিমার এই অভিমানী বিদায় এবং দলের সততা নিয়ে ওঠা এই প্রশ্ন আগামী দিনে বাংলার তৃণমূল শিবিরের অন্দরে বড়সড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।