প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পর্বে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের এক নজিরবিহীন অধ্যায়। সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দিলেন তৃণমূলের তিন প্রাক্তন হেভিওয়েট রাজ্যসভা সাংসদ—সুস্মিতা দেব, সুখেন্দুশেখর রায় এবং প্রকাশ চিক বরাইক। কিন্তু এই হাই-প্রোফাইল যোগদানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যেভাবে তাঁদের রাজ্যসভার উপনির্বাচনের টিকিট দিয়ে পুরস্কৃত করল, তা নিয়ে ইতিপূর্বেই রাজ্য রাজনীতির অন্দরে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশের প্রশ্ন—যে দলবদল বিরোধী নীতি নিয়ে বিজেপি এতকাল সরব ছিল, এই সিদ্ধান্তের পর সেই আদর্শ কি কোথাও ধাক্কা খেল?সংবাদমাধ্যম হিসেবে কোনো রাজনৈতিক সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তাই এই মেগা দলবদলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলের নিচু তলার কর্মীদের একাংশের মনে যে সমস্ত তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উঠছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

দলীয় সূত্রের খবর, যে নেতাদের নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে বিজেপির সাধারণ কর্মীরা এতদিন বুথে বুথে লড়াই করেছেন, আজ তাঁদেরই আকস্মিক অন্তর্ভুক্তি দলের নিচু তলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। যদিও রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, সকলেরই একটা অতীত থাকে এবং বর্তমানে তাঁদের একমাত্র পরিচয় তাঁরা বিজেপির কর্মী। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই, তাঁদেরই রাতারাতি মাথায় বসানো কি আদর্শগতভাবে সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা দেবে না?

সবচেয়ে বেশি জল্পনা তৈরি হয়েছে টিকিট বণ্টনের গতি নিয়ে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ২৪ জুলাইয়ের উপনির্বাচনের জন্য এই তিন নেতার নাম ঘোষণা করে দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যে কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে দলের জন্য মাঠে-ঘাটে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করছেন, তাঁদের উপেক্ষা করে নবাগতদের এভাবে তড়িঘড়ি পুরস্কৃত করায় দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যসভায় অভিজ্ঞতা এবং সংখ্যাতত্ত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই রণকৌশল নেওয়া হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই এই দলবদলকে তীব্র কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের দাবি, সুস্মিতা দেব বা সুখেন্দুশেখর রায়ের মতো নেতারা অতীতেও একাধিকবার দলবদল করেছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হেভিওয়েটদের তড়িঘড়ি দলে টেনে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ায় বিরোধী শিবিরের ‘ওয়াশিং মেশিন’ বা ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’র তত্ত্বটি সাধারণ মানুষের চোখে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যায়।

অবশ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অঙ্ক রয়েছে। রাজ্য বিজেপি শিবিরের দাবি, সুস্মিতা দেবের জাতীয় স্তরের অভিজ্ঞতা এবং প্রকাশ চিক বরাইকের উত্তরবঙ্গের চা-বলয়ের সাংগঠনিক দক্ষতাকে দলের প্রসারে ব্যবহার করাই মূল লক্ষ্য। শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, অভিজ্ঞ নেতাদের দলে শামিল করে মোদীজির হাত শক্ত করাই প্রধান উদ্দেশ্য। বিধানসভায় বিজেপির সংখ্যার নিরিখে এঁদের জয় এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

তৃণমূলের এই ‘ভাঙন’ সাময়িকভাবে বিজেপির সংখ্যাবল বাড়ালেও, দীর্ঘমেয়াদী আদর্শের রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় রয়েছে। দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, বুথ স্তরের উৎসর্গীকৃত কর্মীরাই দলের আসল শক্তি। নেতাদের আমদানি করতে গিয়ে যদি খাঁটি কর্মীদের মন ভেঙে যায়, তবে আগামী দিনে দলকে এর খেসারত দিতে হতে পারে।