প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-আসন্ন উপনির্বাচনের মুখে বাংলার রাজনীতিতে নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকট! অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ (স্থগিত) করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। এই সিদ্ধান্তের পরই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের আইনি উপদেষ্টারা ইতিমধ্যেই এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কিন্তু আইনি এবং সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুপ্রিম কোর্টে কি টিকবে কমিশনের এই অন্তর্বর্তী ধাক্কা?
নির্বাচন কমিশন তাদের অন্তর্বর্তী আদেশে স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘ইলেকশন সিম্বলস (রিজার্ভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার, ১৯৬৮’-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ (Paragraph 15) অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।কমিশনের যুক্তি:১. বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে দুটি স্পষ্ট বিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে—একটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এবং অন্যটি অরূপ রায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন। উভয় পক্ষই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। আগামী ৬ অক্টোবর ২০২৬ রাজ্যের নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। উপনির্বাচনের আগে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কোন গোষ্ঠীটি প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ, তা ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির যদি এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়, তবে আদালত পূর্ববর্তী কয়েকটি ঐতিহাসিক মামলার রায় খতিয়ে দেখবে। সুপ্রিম কোর্টের এই যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, দলের নাম ও প্রতীক কার হাত থাকবে তা নির্ধারণ করার সম্পূর্ণ এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। আদালত এক্ষেত্রে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়—সাংগঠনিক সংস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Organizational Wing) এবং আইনসভা বা সংসদে জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা (Legislative Wing)। ২০২২ সালে শিবসেনা (উদ্ধব বনাম একনাথ শিণ্ডে) এবং ২০২৩ সালে এনসিপি (শরদ পওয়ার বনাম অজিত পওয়ার) ভাঙনের সময়েও ঠিক একইভাবে উপনির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু কমিশনের সেই অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্তে কোনও হস্তক্ষেপ বা স্থগিতাদেশ দেয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে সহজে হস্তক্ষেপ করে না, যদি না সেখানে বড় কোনও পদ্ধতিগত ভুল (Procedural Lapse) প্রমাণিত হয়। মমতা শিবিরের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিতে পারেন যে, এই প্রতীক এবং দল দীর্ঘ তিন দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিচুতলার সিংহভাগ কর্মী ও সমর্থক তাদের সঙ্গেই রয়েছেন। কিন্তু আইনসভা বা বিধানসভায় সংখ্যার সমীকরণ অন্য কথা বলছে। বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনের (দুই-তৃতীয়াংশ) সমর্থন রয়েছে, যা দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে সাহায্য করেছে।
কমিশনের নির্দেশ মেনে আজ, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) সকাল ১১টার মধ্যে দুই শিবিরকেই তিনটি বিকল্প নাম এবং তিনটি মুক্ত প্রতীক (Free Symbols) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী উপনির্বাচনে উভয় পক্ষই সম্পূর্ণ নতুন নাম ও চিহ্নে লড়াই করবে। আইনি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার শুনানিতে কমিশনকে দ্রুত মূল বিরোধের (Para 15 inquiry) নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ফেরানোর সম্ভাবনা আইনত অত্যন্ত ক্ষীণ।