প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন রাজনীতিতে ইতিহাস কি আবার এক নিষ্ঠুর আবর্তে ফিরে আসছে? মে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তৃণমূলের মূল নাম ও প্রতীক ফ্রিজ হওয়া, নন্দীগ্রামে তৃণমূল প্রার্থীর নাটকীয় প্রত্যাহার এবং একের পর এক আইনি গেরোয় যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির কার্যত দিশেহারা, তখন রাজনৈতিক অলিন্দে এক বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—বাংলা কি আবার একটি ‘বিরোধী-শূন্য’ একাধিপত্যের রাজনীতির দিকে এগিয়ে চলেছে? তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস কিন্তু বলছে, বিরোধীদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার এই চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান শাসক দলের জন্যই বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রতিটি বাঁক অত্যন্ত ভালো করে চেনেন। ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের পর তৎকালীন শাসক দল যেভাবে বাম ও কংগ্রেসকে ছলে-বলে-কৌশলে দুর্বল করে বাংলায় ‘বিরোধী-শূন্য’ রাজনীতির এক অলীক মডেল তৈরি করতে চেয়েছিল, তা আজ আর কারও অজানা নয়। রাজপথ থেকে যখনই প্রতিষ্ঠিত বাম-কংগ্রেসের প্রতিবাদের জায়গা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তখনই বাংলার ক্ষুব্ধ ভোটাররা এক বিকল্প মঞ্চের সন্ধান করতে শুরু করে। যার ফলস্বরূপ, বিরোধী স্পেস খালি হতেই সেখানে তরতরিয়ে উত্থান ঘটেছিল বিজেপির, যা শেষ পর্যন্ত ২০২৬-এ তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। আজ যদি শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসন ও আইনি সাঁড়াশি চাপ দিয়ে তৃণমূল বা কংগ্রেসের মতো প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠিত বিরোধীদের সম্পূর্ণ কোণঠাসা বা ধ্বংস করে দিতে চান, তবে সেই ক্ষোভের আগুন আগামী দিনে অন্য কোনো ফর্মে ফেটে পড়তে পারে। কারণ প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, রাজনীতিও ঠিক তেমনই শূন্যতা সহ্য করে না।

রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, মূল ও আক্রমণাত্মক বিরোধী শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন কিছু নরমপন্থী বা ‘ম্যানেজড’ অংশকে স্পেস দেওয়ার সুক্ষ্ম রণকৌশল অনেক সময়ই শাসকরা নিয়ে থাকেন, যারা সরকারের জন্য কোনো বড় মাথাব্যথার কারণ হবে না। কিন্তু সচেতন বাঙালি ভোটারদের সামনে এই ছায়া-বিরোধিতার বা সমঝোতার খেলা বেশিদিন গোপন রাখা যায় না। মানুষ যখনই বুঝতে পারবে যে রাজপথের প্রকৃত প্রতিবাদের জায়গাটা শাসক দল নিজের সুবিধামতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখনই তারা এই সাজানো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিকল্প খুঁজতে শুরু করবে।

শুভেন্দু অধিকারী নিজেকে একজন দক্ষ এবং বাস্তববাদী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। এই মুহূর্তে তাঁর সরকারের সুশাসনের ফোকাস হওয়া উচিত—প্রতিহিংসা বা বিরোধী নিধনের রাজনীতি ছেড়ে সুস্থ ও শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবেশ বজায় রাখা। শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকারের ভুলত্রুটি যেমন সামনে আসে, তেমনই প্রশাসনও সতর্ক থাকে। অতীতে তৃণমূল যে ভুল করে আজ সংকটে পড়েছে, ২০২৬-এর নতুন বিজেপি সরকার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না, নাকি ইতিহাসের চাকা আবার উল্টো ঘুরবে—তার উত্তর অবশ্য ভবিষ্যতেই মিলবে।