প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হতে না হতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নজিরবিহীন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আগামী পরশু, অর্থাৎ ৯ অক্টোবরের মহাগণনার ঠিক আগে এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় কৌতূহল—বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক ‘খাম’ ঠিক কতটা প্রভাব ফেলতে পারল? গতকালের হাইভোল্টেজ নির্বাচনে এই ‘খাম’ শিবির নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপালেও, ভোট-পরবর্তী মাঠের বিশ্লেষণ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প কোনো শক্তি হওয়া তো দূরঅস্ত, ঋতব্রত শিবিরের এই লড়াই আসলে সাবেক শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ কামড়াকামড়ির এক করুণ নিদর্শন মাত্র।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশের দাবি, নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে পুরনো দলীয় প্রতীকটি ফ্রিজ করার পর থেকেই মূল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে এক চরম অহংকারের লড়াই শুরু হয়েছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল নিজেদের আসল উত্তরসূরি দাবি করে ‘খাম’ প্রতীক নিয়ে ময়দানে নামে। কিন্তু তাদের এই রণকৌশল আদতে কোনো স্থায়ী বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। বরং নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের গ্রাউন্ড রিয়্যালিটি বলছে, এই ‘খাম’ প্রতীকটি মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ফুটবলার’ প্রতীকের চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্কে ধস নামানোর একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। দুই শিবিরের এই পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও ভোট কাটার আত্মঘাতী খেলা কার্যত বিজেপির জয়ের মার্জিনকে রেকর্ড স্তরে পৌঁছে দেওয়ার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।
গতকাল বুথের লাইনে থাকা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একটা বড় অংশই বিরোধীদের এই দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। একদিকে মমতা শিবিরের নির্বাচনী ময়দান থেকে পরোক্ষ পিছু হটা, অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরের ‘খাম’ চিহ্নের নতুন পরিচিতি—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয় বিরোধী শিবিরে। রাজনৈতিক পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিভ্রান্তির চোরাস্রোতে ভাসতে না চেয়ে বা কোনো জোড়াতালির জোটে ভরসা না রেখে রাজ্যের শান্তিকামী ও উন্নয়নমুখী ভোটাররা সরাসরি নতুন বিজেপি সরকারের সুশাসনের পক্ষে ইভিএমের বোতাম টিপেছেন। যখন দুই দল নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন গ্রামীণ বাংলা ও পাহাড়-সমতলের একটা বড় অংশই স্থায়িত্বের স্বার্থে পদ্ম চিহ্নে আস্থা রেখেছে।
হিসেব বলছে, রেজিনগরের মতো স্পর্শকাতর এবং সংখ্যালঘু প্রধান আসনেও এই ‘খাম’ প্রতীকটি বড়সড় ভোট কাটার রোল প্লে করেছে। একদিকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP), অন্যদিকে দুই শিবিরের পারস্পরিক আকচাআকচি—এই বহুধা বিভক্ত বিরোধী শিবিরের সুবিধা সরাসরি গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের স্পষ্ট দাবি, ৯ অক্টোবর যখন ব্যালট বাক্স উন্মোচিত হবে, তখন প্রমাণিত হয়ে যাবে যে এই ‘খাম’ আসলে বিরোধীদের নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের চক্করে নিজেদেরই রাজনৈতিক সমাধি রচনার একটি দলিল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বাংলায় সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, তাতে এই ধরণের গোষ্ঠী রাজনীতির দিন যে শেষ হতে চলেছে, গতকালের রেকর্ড ভোটদান তারই অকাট্য প্রমাণ।