প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভোটগণনা কেন্দ্র মানেই যেখানে শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত স্নায়ুর লড়াই আর রাজনৈতিক টানটান উত্তেজনা, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও চরম নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচন। আজ সকাল ৯টায় প্রথম রাউন্ডের পোস্টাল ব্যালট এবং প্রাথমিক ইভিএম গণনা শেষ হতে না হতেই গণনাকেন্দ্র ছেড়ে সটান বাড়ির পথ ধরলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (DAITC)-এর প্রার্থী সফিউজ্জামান শেখ। গণনাকেন্দ্র থেকে এভাবে মাঝপথে প্রার্থীর নাটকীয় বিদায় এবং বাড়ি গিয়ে ‘ঘুমানোর’ সিদ্ধান্তকে ঘিরে তীব্র ট্রোল ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে নেটপাড়ায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের মতে, ব্যালট বাক্সে পদ্ম শিবিরের একচ্ছত্র দাপট দেখেই কার্যত রণে ভঙ্গ দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের ছাড়পত্র মেলার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) থেকে আলাদা হয়ে তৈরি হওয়া এই ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল’-কে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল কম ছিল না। কিন্তু আজ গণনাকেন্দ্র ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে প্রার্থী সফিউজ্জামান শেখ অত্যন্ত উদাসীন মেজাজে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে তাজ্জব বনে গিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তিনি সাফ জানান: “পরিণতি যা হওয়ার হবে। প্রথম রাউন্ডে খাতা খুলেছি দেখলাম। ২-৩ আসনে কিছু ভোট দিয়েছেন মানুষ। জিরো করেনি। বিজেপি এখানকার শাসকদল। আমি আপাতত চলে যাচ্ছি। আমি একটু রেস্ট নেব, ঘুমাব। কাল সারারাত ঘুম হয়নি। চিন্তার কিছু নেই। চিন্তা-ফিকিরের কী আছে? মানুষ চিন্তা করেছেন। আমাদের তো চিন্তার কিছু নেই! আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। তাঁরা চিন্তা করেছেন। ঘুম ভেঙে আর আসার প্রয়োজন হয় কি না সেটাও প্রশ্ন।” তার এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ ভোটারদের একাংশ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জনগণের রায় সম্পূর্ণভাবে সামনে আসার আগেই “ঘুম ভাঙলে আর আসার প্রয়োজন আছে কি না” এমন মন্তব্য করা পরোক্ষভাবে গণতন্ত্র ও সাধারণ ভোটারদের রায়ের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন।
প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটের গণনার পর থেকেই বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার বিপুল ভোট পেয়ে এগিয়ে যান। দ্বিতীয় রাউন্ডের গণনা এগোতেই বিজেপির লিড একলাফে প্রায় ১৬ হাজার পেরিয়ে যায়, যা বিরোধীদের কামড় বসানোর সমস্ত আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। শাসকদল বিজেপির এই রাজকীয় পারফরম্যান্সের সামনে একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল তৃণমূল ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে, ঠিক তেমনই প্রথম রাউন্ডেই নির্বাচনী ময়দান থেকে সশরীরে উধাও হয়ে গিয়েছে ঋতব্রতর ডেমোক্রেটিক তৃণমূল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, উপনির্বাচনের আগে টিকিট বণ্টন নিয়ে দুই তৃণমূলের আকচাআকচি এবং অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরেই মুর্শিদাবাদের মানুষ এই দুই দলকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে বিজেপির স্থিতিশীল ও উন্নয়নমূলক শাসনকেই বেছে নিয়েছেন।
গণনাকেন্দ্রের বাইরে থাকা রাজনৈতিক কর্মীদের একাংশের মতে, প্রথম রাউন্ডেই যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে দ্বিতীয় স্থানের লড়াইয়ে কংগ্রেস কিংবা হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি উঠে আসছে এবং ডেমোক্রেটিক তৃণমূল ধারেকাছেও নেই, তখনই চূড়ান্ত লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে ‘ঘুমের বাহানা’ তৈরি করেন সফিউজ্জামান। ভোটের ময়দানে লড়াই করতে এসে এমন চরম অপেশাদার ও ‘পার্ট-টাইম’ রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এর আগে কখনও দেখা যায়নি বলেই কটাক্ষ করছেন সাধারণ নেটিজেনরা। রেজিনগরের এই ফলাফল এবং গণনাকেন্দ্রের এই বেনজির ছবি প্রমাণ করে দিল যে এই মুহূর্তে মুর্শিদাবাদের মাটিতে পদ্ম শিবিরের অবস্থান কতটা অনড় এবং দুই পক্ষে বিভক্ত হওয়া তৃণমূল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।