প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-উৎসবের মরসুম দোরগোড়ায় আসতেই আচমকা এক চরম শব্দ-বিতর্ক এবং রাজনৈতিক ফতোয়াকে কেন্দ্র করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল বাংলার রাজনৈতিক ময়দান। পুজো মণ্ডপের পাশে বামপন্থীদের ঐতিহ্যবাহী বইয়ের স্টল দেওয়া এবং সেখানে একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা নিয়ে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এবং আলিমুদ্দিনের মধ্যে এক বেনজির সংঘাত তৈরি হয়েছে। এই চরম বিতর্কের মুখে দাঁড়িয়েই এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ফতোয়াকে নজিরবিহীন ভাষায় বিঁধলেন সিপিআইএম (CPIM) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ক্ষুব্ধ মহম্মদ সেলিম স্পষ্ট প্রশ্ন তোলেন, “‘শারদোৎসব’ শব্দটাতে আপত্তি কেন ওদের? এটা কি কমিউনিস্ট শব্দ? গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে এশিয়াতে বিভিন্ন মরসুমে উৎসব হয়। আমরা বর্ষবরণ করি না? আমরা পৌষমেলা করি না? পৌষ উৎসব হয় না?”
মহম্মদ সেলিমের এই তীব্র ও বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একটি সাম্প্রতিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত একটি বিলের বিতর্কের সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বামপন্থীদের কড়া ভাষায় নিশানা করেন। তিনি পুজো কমিটিগুলির কাছে সরাসরি আবেদন জানিয়ে বলেন, পুজো মণ্ডপ চত্বরের কোনো স্টলে যদি ‘দুর্গাপুজো’র বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা হয়, তবে সেই স্টল যেন কোনোভাবেই রাখতে দেওয়া না হয়। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, একশ্রেণির বামপন্থী অধ্যাপক সনাতনীদের আক্রমণ করছেন এবং বামপন্থীরা দুর্গাপুজোকে কেবল একটি ‘সাংস্কৃতিক’ বিষয় বলে মনে করে। সেই কারণেই তারা পবিত্র ধর্মীয় নাম ‘দুর্গাপুজো’ মুখে না এনে ‘শারদোৎসব’ শব্দটি ব্যবহার করতে বেশি স্বচ্ছন্দ। শুভেন্দুর সাফ হুঁশিয়ারি, “কমিউনিস্টরা শারদোৎসবের জায়গায় যদি দুর্গাপুজো লেখে, একটা স্টলও করতে দেবে না।”
দুর্গাপুজোর মণ্ডপ চত্বরে প্রগতিশীল সাহিত্যের স্টল দেওয়া বিভিন্ন বামপন্থী দলের বহু বছরের পুরনো রেওয়াজ। ধর্মাচরণের সঙ্গে সম্পর্ক না রেখেও সামাজিক উৎসবে মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতেই মূলত এই আয়োজন করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর এই চরম হুঁশিয়ারি ও ফতোয়ার জবাবে মহম্মদ সেলিম এই শব্দ-বিতর্কের প্রেক্ষাপটে একাধিক জোরালো কারণ ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। শুভেন্দু অধিকারীর এই বিবৃতির পরই সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত নাটক ‘শারদোৎসব’-এর প্রচ্ছদের ছবি পোস্ট করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই শব্দটি কোনো কমিউনিস্টদের তৈরি শব্দ নয়, এটি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বহু পুরনো অঙ্গ।
সেলিম স্পষ্ট করেন যে, বিশ্বজুড়ে বা এশিয়াতে মরসুমভিত্তিক সামাজিক উদযাপনের রীতি রয়েছে। বাঙালি যেভাবে কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণতা ছাড়া ‘পৌষমেলা’, ‘পৌষ উৎসব’ কিংবা ‘বর্ষবরণ’ পালন করে, ঠিক সেভাবেই ‘শারদোৎসব’ও শরৎকালের একটি সার্বজনীন রূপ। মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভের জবাবে কিছুটা ব্যঙ্গের সুরে সেলিম বলেন, “এসব জানে না বলে এসব কথা বলছে। শিখবে, একটু বয়স হবে আস্তে আস্তে শিখবে।” পাশাপাশি সুজন চক্রবর্তীর মতো বাম নেতারাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “যা লিখতাম, তা-ই লিখব! বইকে ওরা ভয় পায়, বই আটকানো ফ্যাসিবাদের কাজ।” শুভেন্দু অধিকারীর ‘শারদোৎসব’ শব্দ বাতিলের এই কড়া হুঙ্কার এবং তার জবাবে আলিমুদ্দিনের এই পাল্টা চ্যালেঞ্জ পুজো শুরুর আগেই বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।