প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেও, কলকাতা পুরসভার (KMC) নাগরিক পরিষেবা নিয়ে খোদ দলের অন্দরেই তৈরি হলো নজিরবিহীন অসন্তোষ। উৎসবের মরসুমে শহর জুড়ে ডেঙ্গির দাপট বাড়তেই এবার কলকাতা পুরসভার বর্তমান প্রশাসনিক পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন উত্তর কলকাতার কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি।
বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় কোনো নির্বাচিত বোর্ড নেই এবং এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারি প্রশাসক (Administrator) দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমলাদের অধীনে থাকা পুরসভার কাজ নিয়ে বিজেপি বিধায়কের এমন চাঁছাছোলা আক্রমণ শহরের রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি কলকাতা পুরসভার বর্তমান পরিষেবাকে তীব্র আক্রমণ করে সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট বলেন, “গত ৩-৪ মাসে কলকাতা পুরসভার পরিষেবা বিগত তৃণমূল জমানার চেয়েও খারাপ রূপ ধারণ করেছে! ফটোশুট করে বা পুরভবনে বসে বড় বড় প্রেস কনফারেন্স করে ডেঙ্গির মতো মারাত্মক পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায় না।” তিনি অভিযোগ তোলেন, জুনের শুরু থেকেই কাশীপুর এলাকার নোংরা-আবর্জনায় ভরা ৩০ টিরও বেশি পুকুর ও ডোবা পরিষ্কারের জন্য তিনি পুরসভার দফতরে লিখিত আবেদন জানিয়েছিলেন। পরিবেশ ও নিকাশি দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও আমলারা কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ করেননি।
এই সংঘাতের পেছনে উঠে এসেছে পুরসভার আধিকারিক ও নিচুতলার কর্মীদের ভুল পরিসংখ্যান দিয়ে উপরতলাকে সন্তুষ্ট রাখার এক মারাত্মক প্রবণতা। বিধায়কের অভিযোগ, সম্প্রতি রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল যখন কাশীপুর-বিটি রোড সংলগ্ন অঞ্চলে ডেঙ্গি পরিস্থিতি সশরীরে খতিয়ে দেখতে আসেন, তখন পুর আধিকারিকরা মন্ত্রীকে আসল উপদ্রুত এলাকাগুলি দেখানইনি। রীতেশ তিওয়ারির দাবি, মন্ত্রী যাতে মশার লার্ভা ও আবর্জনাভরা ডোবাগুলো দেখতে না পান, তার জন্য আধিকারিকরা অত্যন্ত সুকৌশলে মাত্র ৫০ মিটারের একটি আগে থেকে পরিষ্কার করে রাখা ‘বাছাই’ করা অঞ্চল ঘুরিয়ে মন্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভের পেছনে মূলত কাজ করছে আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতা ও জনপ্রতিনিধিদের দূরত্বের চিরাচরিত জটিলতা।পুরসভায় নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় বর্তমানে সাধারণ মানুষ যেকোনো নাগরিক এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার জন্য সরাসরি স্থানীয় বিধায়কের ওপর নির্ভর করছেন। অথচ পুরসভা যেহেতু সরকারি প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে চলছে, তাই নিচুতলার আমলারা জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ বা অভাব-অভিযোগকে সঠিক গুরুত্ব দিচ্ছেন না। রীতেশ তিওয়ারির এই বিস্ফোরণ মূলত সেই অনমনীয় আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধেই, যা প্রকারান্তরে তাঁর নিজের দলেরই সরকারের কাজের পদ্ধতিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
দলীয় বিধায়কের এমন প্রকাশ্য এবং তীব্র আক্রমণে অস্বস্তিতে পড়লেও অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ জবাব দিয়েছেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি জানান যে, পুর আধিকারিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, কারণ ওই এলাকাটিই (৬ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন অঞ্চল) কলকাতার সবথেকে বেশি ডেঙ্গি আক্রান্ত এলাকা বা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত। মন্ত্রী আরও যোগ করেন, “রীতেশ হয়তো নির্দিষ্ট কোনো পকেটের বা এলাকার কথা বলছেন। আমি অবশ্যই তাঁর সাথে কথা বলব এবং প্রয়োজন হলে নিজে গিয়ে সেই জায়গাটি আরেকবার পরিদর্শন করব।” রাজ্যে বর্তমানে ডেঙ্গির কারণে স্বাস্থ্য দফতর ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ জারি রেখেছে। এই আবহে একই শাসক দলের মন্ত্রী ও বিধায়কের মধ্যে পুর-প্রশাসনের কাজ নিয়ে এমন প্রকাশ্য টানাপোড়েন প্রমাণ করছে যে, বিজেপি সরকার পরিচালনায় এলেও পুরসভার আমলাদের কাজ করার ধরনে দল এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছে না।