প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর বসন্তের বাতাসে এখন আর শুধু পলাশের লাল নেই, মিশেছে রাজনীতির চড়া রং। বাংলার মসনদ দখলের লড়াইয়ে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে বাক্যবাণ। রাজনীতির ময়দান এখন এক বিশাল দাবার বোর্ড, যেখানে চাল আর পাল্টা চালে তটস্থ জনতা। গতকাল দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমা থেকে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে হুঙ্কার ছেড়েছেন, তার পাল্টা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুরের অলিতে-গলিতে দাঁড়িয়ে শুভেন্দুর দেওয়া সেই ‘ডবল ডিজিট’ চ্যালেঞ্জ এখন রাজ্য রাজনীতির প্রধান চর্চার বিষয়।

পাথরপ্রতিমার জনসভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক অলীক লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আসন্ন নির্বাচনে বিজেপিকে নাকি তিনি ৫০-এর গণ্ডিও পার হতে দেবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘পঞ্চাশ’-এর তত্ত্ব আসলে তৃণমূলের অন্দরের টলমল অবস্থাকে ঢাকার এক মরিয়া চেষ্টা। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে জনতার ক্ষোভ—শাসক শিবিরের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকেছে। কবির ভাষায় বললে, “প্রদীপের নিচে অন্ধকার যত ঘন হয়, শিখার আস্ফালন তত বৃদ্ধি পায়।”
অভিষেকের এই মন্তব্যকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক দর্প’ হিসেবে দেখছেন। যেখানে গত লোকসভা নির্বাচনেও বাংলার মানুষ দু’হাত তুলে বিজেপিকে আশীর্বাদ করেছেন, সেখানে বিধানসভায় বিজেপিকে ৫০-এর নিচে নামিয়ে দেওয়ার দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে খোদ শাসকদলের নীচুতলার কর্মীদের মধ্যেই ফিসফাস শুরু হয়েছে।

অভিষেকের এই তর্জন-গর্জনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রণক্ষেত্র বদলে যায় কলকাতার হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র ভবানীপুরে। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর গড়ে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী যে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, তা তৃণমূল শিবিরের রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। শুভেন্দু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তৃণমূল এবার কোনোভাবেই ‘ট্রিপল ডিজিট’ বা তিন অঙ্কের সংখ্যা (১০০) স্পর্শ করতে পারবে না। অর্থাৎ, ঘাসফুল শিবিরের দৌড় থেমে যাবে ‘ডবল ডিজিট’ বা দুই অঙ্কের ঘরেই।

শুভেন্দুর এই দাবির পেছনে রয়েছে এক সুগভীর গাণিতিক হিসেব। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে রাঢ়বঙ্গ, এমনকি খাস কলকাতাতেও এখন পদ্ম-হাওয়া প্রবল। শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষের নীরব প্রতিবাদ যখন ব্যালট বাক্সে আছড়ে পড়বে, তখন তৃণমূলের ডবল ডিজিট রক্ষা করাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসী সুর বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বিজেপির রণকৌশল এবার অনেক বেশি আঁটোসাঁটো।

আর এই দুই মেরুর লড়াইয়ে বাংলার মানুষ এখন এক অদ্ভুত রসালো রাজনীতির স্বাদ পাচ্ছেন। একদিকে যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আউট’ করার কথা বলছেন, তখন শুভেন্দু অধিকারী ‘স্কোরবোর্ড’ নামিয়ে আনার গাণিতিক বিশ্লেষণ দিচ্ছেন। বাংলার সংস্কৃতিতে বাগযুদ্ধের এক আলাদা স্থান রয়েছে, আর এবারের নির্বাচন সেই ঐতিহ্যকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে শুভেন্দুর বক্তব্যে যে গাম্ভীর্য আর তথ্যনিষ্ঠা ফুটে উঠেছে, তা সাধারণ ভোটারদের
ভাবিয়ে তুলেছে।

বিরোধীদের মতে, যে সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পের হিসেব দিতে ভয় পায়, যে সরকারের আমলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে আদালত বারবার সরব হয়েছে, সেই সরকারের পতন এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘ডবল ডিজিট’ তত্ত্ব আসলে সেই আসন্ন পতনেরই আগাম সংকেত।

বাংলার রাজনীতির এই মহানাটকে এখন পর্দা ওঠার অপেক্ষা। একদিকে যেমন দম্ভের আস্ফালন রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে পরিবর্তনের সংকল্প। শুভেন্দু অধিকারীর মাপা চাল এবং তৃণমূলের ডবল ডিজিটে ইতি টানার অঙ্গীকার কি বাস্তবে ফলবে? রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছে, হাওয়ার অভিমুখ এখন পরিবর্তনের দিকেই।ভবানীপুরের অলিগলি থেকে শুরু করে সুন্দরবনের জলপথ—সবই এখন ২০২৬-এর ফলের অপেক্ষায়। তবে দিনের শেষে মানুষের রায়ই শিরোধার্য। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাশ’-এর স্বপ্ন সফল হবে নাকি শুভেন্দু অধিকারীর ‘ডবল ডিজিট’ তত্ত্ব তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতবে, তার উত্তর দেবে একমাত্র সময়। আপাতত এই দুই মহারথীর বাগযুদ্ধ উপভোগ করছে সাতকোটি বঙ্গবাসী।