প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতির ময়দানে জোয়ার-ভাটা আসে। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ যে এভাবে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মুখে পড়ে ধূলিসাৎ হতে পারে, গতকাল তার এক নজিরবিহীন ও জলজ্যান্ত প্রমাণ দেখল উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহর। রবিবার বিকেলে হালিশহরে যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছন, তখন তাঁর জন্য কোনো লাল কার্পেট বিছানো ছিল না। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিগত দিনে বঞ্চিত, শোষিত আর সিন্ডিকেট রাজের অত্যাচারে ত্যক্ত-বিরক্ত আমজনতার জমানো বারুদ! একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া এবং পরবর্তীতে পুলিশ হেফাজতে মৃত এক তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু তিনি এলাকায় পা দেওয়া মাত্রই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যায়। দলীয় কোনো ঝান্ডা ছাড়াই কাতারে কাতারে স্থানীয় সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি ঘিরে ধরেন। চারদিক থেকে আছড়ে পড়তে থাকে তীব্র ধিক্কার ও স্লোগান। জনতার কণ্ঠ চিরে একযোগে আওয়াজ ওঠে—”চোর চোর” এবং “ডাকাত রানি”! পরিস্থিতি এতটাই অগ্নিগর্ভ ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে যে, ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ জুতো উঁচিয়ে ধরেন এবং ক্ষোভের চোটে কাদা ও চপ্পল ছেটানো হয় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বহুমূল্য গাড়ির কাচে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো কালঘাম ছুটে যায় উপস্থিত পুলিশ ও র‍্যাফ কর্মীদের।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ৫০০-১০০০ টাকা নেওয়ার পর বাংলার মানুষ নিজেদের আত্মসম্মান আর রাজ্যের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ভুলে যাবে—এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন জোড়াফুলের চাণক্যরা? কিন্তু হালিশহর প্রমাণ করে দিল, হিসেব অতটা সহজ নয়। যে উত্তর ২৪ পরগনা একসময় তৃণমূলের অপরাজেয় দুর্গ বলে পরিচিত ছিল, সেখানেই আজ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি দেখে জুতো উঁচিয়ে ধরছেন স্বতঃস্ফূর্ত আমজনতা! যখন ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে একের পর এক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, রেশন দুর্নীতি আর কয়লা পাচারের মতো ঘটনা ঘটে, তখন তার শেষ পরিণতি এমনই হয়। আমজনতা যখন সশরীরে জবাব চাইতে রাস্তায় আসে, তখন কোনো রাজকীয় নিরাপত্তা বা প্রোটোকল কাজে আসে না। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিক্ষোভে কোনো রাজনৈতিক দলের উসকানি বা ঝান্ডা ছিল না। এটি ছিল স্রেফ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ।

চুরি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন খোদ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এমন কড়া তাড়া করে, তখন তাকে আর ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বা ‘বিজেপির ষড়যন্ত্র’ বলে পার পাওয়া যায় না। বিগত দিনে বাংলায় যে অপশাসন চলেছে, তার বিরুদ্ধে মানুষের মনের ভেতরের রাগটা যে কতটা গভীর, হালিশহরের কাদা-লেপা গাড়ির কাচ আজ সেটাই স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি অত্যন্ত বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। কারণ গতকাল হালিশহরের রাস্তায় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল জেতেনি, জিতেছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ।