প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভোট মিটেছে, ক্ষমতাও গেছে। আর শাসনক্ষমতার মধু ফুরোতেই চেনা ‘দাদা’, ‘বস’ আর ‘অনুগামীরা’ যে যার মতো কেটে পড়েছেন। সোনারপুরে ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত এক কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে প্রবল জনরোষ এবং ‘চোর’ স্লোগানের মুখে পড়লেন, তা নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। কিন্তু এই নজিরবিহীন অপমানের পরও দলের সিংহভাগ নেতার এই রহস্যজনক নীরবতা দেখে আর চুপ থাকতে পারলেন না তৃণমূলের কুণাল ঘোষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর বিস্ফোরক পোস্ট আসলে ক্ষমতাচ্যুত এক দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার কঙ্কালসার চেহারাটাই সাধারণ মানুষের সামনে এনে দিল।
কুণাল ঘোষ তাঁর পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে লিখেছেন যে, অভিষেকের ওপর হামলার প্রতিবাদে অন্য দলের জাতীয় স্তরের নেতাদের পোস্ট দেখা গেলেও, নিজের দলের বহু প্রাক্তন সাংসদ, বিধায়ক, কাউন্সিলরদের কোনও হেলদোল নেই। কুণালের সবচেয়ে বড় ও বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিটি ছিল— “অথচ সরকারটা তৃণমূলের থাকলে এঁদের অনেকের বোলচাল অন্যরকম হত।” অর্থাৎ, কুণাল নিজেই যেন মেনে নিচ্ছেন, দল ক্ষমতায় নেই বলেই আজ নেতারা সেনাপতিকে ফেলে মুখ লুকিয়ে বসে আছেন।
বিরোধী তথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুণাল ঘোষের এই একটি পোস্টেই তৃণমূলের আসল সত্যিটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। আদর্শের কোনো বালাই ছিল না, শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে ও কাটমানির স্বার্থে যারা এতদিন ‘দিদি-অভিষেক’ জপ করতেন, ক্ষমতা যেতেই তাঁরা এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন। সোনারপুরে আমজনতা যেভাবে ঝাঁটা হাতে, ডিম ছুড়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছে, তা দেখে তৃণমূলের বাকি নেতারা বুঝে গেছেন—জনগণ তাঁদের আর রেয়াত করবে না। সেই ভয়েই তাঁরা সোশ্যালে পর্যন্ত মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। ক্ষমতার অলিন্দে থাকতে যারা সারাক্ষণ ভিডিও আর সেলফি তুলে নিজেদের বড় অনুগামী প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকতেন, আজ চরম বিপদের দিনে তাঁদের টিকিটিরও দেখা মিলছে না।
কুণাল ঘোষ এটিকে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রকাশ বা নেতাদের একাংশের ‘উদাসীনতা’ বলে ব্যাখ্যা করতেই পারেন। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর এমনিতেই যেখানে একের পর এক তৃণমূল কাউন্সিলর ও নেতার দলত্যাগের হিড়িক পড়েছে, সেখানে কুণাল ঘোষের এই মন্তব্য যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালল। ক্ষমতা হারানোর পর যে দলটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে এবং শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর থেকে নিচুতলার বিশ্বাস সম্পূর্ণ উঠে গেছে, কুণালের পোস্টই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এখন দেখার, এই ‘বসন্তের কোকিল’দের চিহ্নিত করে দল কোনও ব্যবস্থা নিতে পারে, নাকি বিরোধী আসনে বসার পর এই গৃহযুদ্ধেই তৃণমূলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়।