প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং তাদের সংরক্ষিত ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ (স্থগিত) করার সিদ্ধান্তের পর বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে যে নাম এবং প্রতীকের ওপর ভর করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক রাজনৈতিক লড়াই জিতেছেন, আজ তা আইনি জাঁতাকলে পড়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ। রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর দলের এই প্রতীক ও নাম হাতছাড়া হওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত অস্তিত্বের সংকট।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমাপতন দেখছে বাংলা। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি কংগ্রেসের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক। তিন দশক ধরে এই ঘাসফুলই ছিল মমতার একক লড়াই, সততা এবং লড়াকু ইমেজের প্রতীক।কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দল ভেঙে দুই টুকরো হওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের প্যারাগ্রাফ ১৫-এর অধীনে এই প্রতীক ফ্রিজ হয়ে যাওয়া তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর এক বিরাট ধাক্কা। ৩ দশক আগের সেই শূন্যস্থান থেকে লড়াই আর আজকের হারের পর দল বাঁচানোর লড়াইয়ের মধ্যে এক আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে বলেই মনে করছেন প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘ব্র্যান্ড মমতা’। বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত রাজনৈতিক প্রবাদ ছিল—”তৃণমূলের ২৯৪টি আসনেই প্রার্থী আসলে একজনই, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।” কিন্তু ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই জাদুদণ্ড কতটা কাজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।বিদ্রোহের জেরে ইতিমধ্যেই আইনসভা এবং জেলা স্তরের বহু প্রবীণ নেতাকর্মী অরূপ রায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী শিবিরের দিকে ঝুঁকেছেন। আজ, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) সকাল ১১টার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে মমতা শিবিরকে সম্পূর্ণ নতুন তিনটি বিকল্প নাম ও মুক্ত প্রতীক জমা দিতে হয়েছে। ফলে আসন্ন ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক প্রতীকে লড়াই করতে হবে তাঁর গোষ্ঠীকে।

আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ সহজে কাটার নয়। দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ে যদি শেষ পর্যন্ত আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Legislative Majority) জোরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীই ‘আসল তৃণমূল’ এবং ঘাসফুল প্রতীকটি স্থায়ীভাবে পেয়ে যায়, তবে মমতাকে সম্পূর্ণ নতুন দল গঠন করে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই একজন ‘স্ট্রিট ফাইটার’। অতীতে বহুবার তিনি খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু জীবনের এই সায়াহ্নে এসে, সরকারি ক্ষমতা এবং চিরপরিচিত দলীয় প্রতীক—উভয়ই হারিয়ে কেবল নিজের ব্যক্তি-ইমেজের জোরে তিনি বাংলার গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ককে আবার কতটা নিজের দিকে টানতে পারবেন, সেটাই এখন ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।