প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং তাদের সংরক্ষিত ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ (স্থগিত) করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। নির্বাচন কমিশনের এই নজিরবিহীন অন্তর্বর্তী নির্দেশের পরই জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে শুরু হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। দেশের তাবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার এই রাজনৈতিক মহাসংকট আসলে ২০২২ এবং ২০২৩ সালের মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (NCP)-র ঐতিহাসিক ভাঙনের হুবহু পুনরাবৃত্তি। যেভাবে মুম্বইয়ের রাজনীতিতে বাল ঠাকরে বা শরদ পওয়ারের তৈরি দল হাতছাড়া হয়েছিল, ঠিক একই স্ক্রিপ্ট মেনে এবার কলকাতার রাজনীতিতেও কি কোণঠাসা হতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

আজ থেকে চার বছর আগে, ২০২২ সালের জুনে শিবসেনার অন্দরে একনাথ শিণ্ডে বিদ্রোহী হয়ে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানান। এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে একইভাবে এনসিপি-র অন্দরে বিদ্রোহ ঘোষণা করে কাকা শরদ পওয়ারের হাত থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেন ভাইপো অজিত পওয়ার। উভয় ক্ষেত্রেই ঘটনাটি নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়ায় এবং ঠিক বর্তমান তৃণমূলের মতোই উপনির্বাচনের আগে দলগুলির নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছিল।পরবর্তীকালে দীর্ঘ শুনানির পর নির্বাচন কমিশন দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে স্পষ্ট করে দেয়। যে গোষ্ঠীর পক্ষে সিংহভাগ বিধায়ক (MLA) এবং সাংসদ (MP) থাকবেন, তারাই আসল দল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে ‘তীর-ধনু’ প্রতীক শিণ্ডে শিবিরের কাছে এবং শরদ পওয়ারের ‘ঘড়ি’ প্রতীক অজিত পওয়ার শিবিরের কাছে চলে যায়।

মহারাষ্ট্রের সেই ছক মেনেই এবার বাংলায় অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন অরূপ রায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী। দল ভাঙার ক্ষেত্রে এই বিদ্রোহী শিবির অত্যন্ত চতুরতার সাথে আইনি সমীকরণ বজায় রেখেছে। দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) এড়াতে মোট বিধায়কদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক তাদের পক্ষে সই করেছেন। বিদ্রোহী শিবিরের আইনজীবীরা কমিশনে যুক্তি দিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই তৃণমূলের পুরোনো ওয়ার্কিং কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সময়ে বিদ্রোহী কমিটিই বৈধ। প্রবীণ বাম নেতা ডি. রাজা এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, “আঞ্চলিক দলগুলি যখন অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়ায়, তখন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এনসিপির পর এখন তৃণমূলের এই ভাঙন তারই প্রমাণ।”

নির্বাচন কমিশন তাদের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অর্ডারে স্পষ্ট করেছে, ‘ইলেকশন সিম্বলস অর্ডার ১৯৬৮’-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুই শিবিরের জমা দেওয়া নথি খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু সামনেই ৬ অক্টোবর ২০২৬ নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর কেন্দ্রের উপনির্বাচন থাকায় ভোটারদের বিভ্রান্তি রুখতে এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জরুরি ছিল। ইতিহাস বলছে, নির্বাচন কমিশন যখনই কোনও আঞ্চলিক দলের প্রতীক ফ্রিজ করেছে, পরবর্তীতে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীই মূল দল ও প্রতীক হাতিয়ে নিয়েছে। ফলে আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের দরবারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেগ দিয়ে লড়াই করলেও, সংখ্যার খেলায় মহারাষ্ট্রের উদ্ধব ঠাকরে বা শরদ পওয়ারের মতোই পরিণতি হতে পারে তাঁর।