প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! ঠিক ২৮ বছর আগে, ১৯৯৭ সালের শেষলগ্নে তৎকালীন কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে যে লড়াকু মেজাজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ছেড়েছিলেন, আজ যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল তাঁর নিজের রাজনৈতিক জীবনে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তৃণমূলের মূল নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ফ্রিজ (স্থগিত) করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আর এই মহাসংকটের দিনে বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে এবং সমাজমাধ্যমে ঘুরেফিরে আসছে একটিই নাম—প্রয়াত রাজনৈতিক চাণক্য মুকুল রায়। রাজনীতিতে একটা কথা প্রচলিত আছে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি তৃণমূলের ‘ব্র্যান্ড’ হন, তবে মুকুল রায় ছিলেন সেই ব্র্যান্ডের ‘ম্যানুফ্যাকচারার’। আজ প্রতীক হারানোর এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের দিনে কেন বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন তিনি?
মুকুল রায়ের রাজনীতির মূল ভিত্তিই ছিল দলের ভেতরের অসন্তোষকে বাগে রাখা। তৃণমূল যখনই কোনও বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, মুকুল রায় নিজে উদ্যোগী হয়ে ক্ষুব্ধ নেতাদের মান ভাঙিয়েছেন, তাঁদের ক্ষোভের কথা শুনেছেন এবং যোগ্য সম্মান দিয়ে দলে ধরে রেখেছেন।বর্তমান তৃণমূল নেতৃত্বে সেই মাটির মানুষের নাড়ি নক্ষত্র চেনার মতো ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলার’ বা সংকটমোচকের অভাব তীব্রভাবে স্পষ্ট। দল যখন বিদ্রোহী শিবির এবং মূল শিবিরের মধ্যে আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে নির্বাচন কমিশনের দোরগোড়ায় পৌঁছাল, তখন তা আটকানোর মতো কোনও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মস্তিস্ক মমতার পাশে ছিল না।
মুকুল রায় কেবল বুথ স্তরের সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দের চাণক্য। নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট কিংবা দিল্লির জাতীয় স্তরের লবিংয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জনসংযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। বিদ্রোহী শিবির যখন ভেতরে ভেতরে বিপুল সংখ্যক বিধায়ক ও সাংগঠনিক পদাধিকারীর সই সংগ্রহ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি পেশ করল, তখন বর্তমান নেতৃত্ব তা আগে থেকে আঁচ করতেও পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লির দরবারে সঠিক ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি এবং আইনি লবিংয়ের ব্যর্থতার কারণেই আজ মমতাকে তাঁর নিজের তৈরি প্রতীক হারাতে হলো।
বিগত কয়েক বছরে তৃণমূলের অন্দরে কর্পোরেট স্টাইলে দল পরিচালনার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোনো ও পোড়খাওয়া কর্মীদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। মুকুল রায়ের জমানায় দল চলত কর্মীদের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে। কিন্তু নতুন জমানায় সেই ঘরোয়া সংযোগের অভাব তৈরি হওয়ায় কর্মীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন, যা প্রকারান্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাত শক্ত করেছে। চলতি বছরের শুরুতে মুকুল রায়ের প্রয়াণ ঘটেছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে যেভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তাঁরই জল-হাওয়া দিয়ে গড়ে তোলা দল, তা নিঃসন্দেহে এক বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। আজ ‘জোড়াফুল’ ফ্রিজ হওয়ার এই ঐতিহাসিক দিনটি প্রমাণ করে দিল—সাংগঠনিক দূরদর্শিতার অভাব থাকলে সেনাপতিহীন দুর্গের পতন কতটা দ্রুত এবং নির্মম হতে পারে।