প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বাংলায় পরিবর্তনের পর পরিবর্তনের যে হাওয়া বইছে, তার শেষ অঙ্কটা কি এবার কালীঘাটের দোরগোড়ায় এসে থামল? প্রশ্নটা আজ আর কোনো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের ড্রয়িংরুমের নয়, প্রশ্নটা এখন বাংলার অলিতে গলিতে। যে দলের জন্ম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে, যে দল সুদীর্ঘ আড়াই দশক ধরে তাঁর অঙ্গুলিহেলনে চলেছে, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের রাশ কি আজ সত্যিই তাঁর হাত থেকে ফসকে গেল? রাজনীতির অন্দরের খবর যা বলছে, তাতে ‘পিসি-ভাইপোর’ দলের শেষের সেদিন বোধহয় আর খুব বেশি দূরে নেই। ক্ষমতা যাওয়ার পর থেকেই তাসের ঘরের মতো ভাঙতে শুরু করেছিল তৃণমূল। কিন্তু ফাটলটা যে এত গভীর, তা হয়তো কালীঘাটের কর্ত্রীও টের পাননি। সূত্রের খবর, বিধানসভার মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫০-এরও বেশি বিধায়ক এখন দলত্যাগী ও বহিষ্কৃত নেতৃত্বের শিবিরে। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, খোদ বিধানসভার স্পিকার পর্যন্ত বিদ্রোহী শিবিরের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত প্রার্থীর আর কোনো আইনি অস্তিত্বই রইল না পরিষদীয় দলে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংখ্যাধিক্যই যেখানে শেষ কথা, সেখানে পিসির একনায়কতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিধায়করা আজ নিজের পথ বেছে নিয়েছেন। একেই বোধহয় বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসতে চলেছে দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে। দিল্লির নির্বাচন কমিশনের অলিন্দে এখন একটাই আলোচনা—মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের যে দশা হয়েছিল, বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কি সেই গতি হতে চলেছে? আইন বলছে, যদি বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিধানসভার পাশাপাশি দলের মূল সাংগঠনিক কমিটিতেও নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারে, তবে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক এবং ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটার ওপর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে তাঁদেরই। আর যদি আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হয়, তবে নির্বাচন কমিশন প্রতীকটি ‘ফ্রিজ’ বা চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পারে। যে প্রতীকের অহংকারে এতদিন বিরোধীদের “উইপোকা” বা “চুনোপুঁটি” বলে কটাক্ষ করা হতো, সেই প্রতীকটাই যদি চলে যায়, তবে তৃণমূলের সাইনবোর্ডটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে না।

দল বাঁচাতে এখন মরিয়া কালীঘাট। তড়িঘড়ি সমস্ত পুরনো কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, সিআইডি-কে দিয়ে বিধায়কদের সই জালের গল্প সাজিয়ে তদন্তের ভয় দেখানো হচ্ছে। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল বলছে, ভয় দেখিয়ে আর কতদিন? যখন দলের অন্দরেই পিসি-ভাইপোর একাধিপত্য আর ভাইপোর ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’-র বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন খোদ দলেরই আদি লড়াকু কর্মীরা, তখন সেই ক্ষোভ চাপা দেওয়া যায় না। ক্ষমতার দম্ভে যাঁরা এতদিন সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করেননি, আজ তাঁদেরই নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে আদালতের দরজায় দরজায় ঘুরতে হচ্ছে।

তৃণমূলের অন্দরের এই নজিরবিহীন গৃহযুদ্ধ আসলে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের অনিবার্য পরিণতি। পরিবারতন্ত্র আর তোষণের রাজনীতি যে বেশিদিন বাঁচে না, ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি পারবেন এই ডুবে যাওয়া জাহাজকে টেনে তুলতে, নাকি বাংলায় ‘তৃণমূল’ অধ্যায়ের চিরতরে সমাপ্তি ঘটে নতুন কোনো ভোরের সূচনা হতে চলেছে? উত্তর দেবে সময়, তবে আপাতত ঘাসফুলের শিকড় যে উপড়ে গেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।