প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সেই বিখ্যাত গানের কলি মনে পড়ে? “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা…”। তবে গতকাল বিকেলে নবান্ন সভাঘরের পরিবেশটা যদি আপনি দেখতেন, তবে প্রিয়তমা নয়, আপনার মনে হতো—বাংলা আজ অভিবাদন জানাচ্ছে গণতন্ত্রের সেই অতন্দ্র প্রহরীদের, যাঁরা ১৯৭৫-এর ভয়াল, অন্ধকার জরুরি অবস্থার দিনগুলোতে নিজের যৌবন, নিজের স্বাধীনতা বন্ধক রেখেছিলেন স্রেফ দেশের গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখবেন বলে। গতকাল, ৯ আগস্ট ২০২৬ (রবিবার), রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় নবান্নের সভাঘরে আয়োজিত এক অত্যন্ত আবেগঘন এবং নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সেই বীর সংগ্রামীদের ‘পশ্চিমবঙ্গ লোকতন্ত্র সেনানি সম্মান’ প্রদান করল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার।

অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে উপস্থিত থেকে রাজ্যের প্রায় ৩২৫ জন লোকতন্ত্র সেনানীর হাতে সম্মাননা পত্র ও তাম্রপত্র তুলে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গতকালকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল এর ভাষা এবং সংস্কৃতি। খোদ মুখ্যমন্ত্রী যখন আশি-ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ সংগ্রামীদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করছিলেন, তখন সভাঘরের অনেকের চোখেই জল।মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন, “আজকের এই নতুন সরকার কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আপনাদের মতো বীর সেনাদের ত্যাগের মহান আদর্শের ওপর দাঁড়িয়েই আজ বাংলায় পরিবর্তন এসেছে।”

বিজেপির ঘনিষ্ঠ মহল এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাম এবং তৃণমূল জমানায় এই লোকতন্ত্র সেনানীদের কার্যত বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই সেই ঐতিহাসিক অন্যায়ের সংশোধন করল। মঞ্চ থেকে লোকতন্ত্র সংগ্রামীদের জন্য একগুচ্ছ আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রত্যেক লোকতন্ত্র সেনানীকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা করে আজীবন সাম্মানিক পেনশন দেওয়া হবে। সংগ্রামী প্রয়াত হলে তাঁর পরিবার বা জীবনসঙ্গী সমপরিমাণ এই সরকারি পেনশনের সুবিধা পাবেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য মাসিক ১,০০০ টাকার অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা এবং সমস্ত সরকারি বাসে বিনামূল্যে আজীবন যাতায়াতের বিশেষ কার্ড দেওয়া হবে।

নবান্নের মঞ্চ থেকে বিগত জমানার দীর্ঘ রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও তোষণের রাজনীতির অবসান নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যায়, এই সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, বাংলায় আর কোনো সুনির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের রাজনীতি চলবে না; রাজদণ্ড চলবে সবার জন্য সমান সুশাসনের নিয়মে। এর পাশাপাশি, ইতিহাস বিকৃতির অবসান ঘটিয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলার মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে বাংলার পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে রাখার যে সুপরিকল্পিত বাম-তৃণমূলী চেষ্টা চলেছিল, তার অবসান ঘটছে। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রকৃত আদর্শ, দেশপ্রেম এবং বাংলার দেশভাগের আসল ও সত্য ইতিহাস এবার রাজ্যের স্কুল পাঠ্যক্রমে (School Syllabus) বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর রূপরেখা তৈরি করতে আগামী ১৩ আগস্ট নবান্নে মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি সরকারি ভাতা প্রদানের অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রবাদী গৌরবকে নবান্নের অলিন্দে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক অনন্য লড়াই।