প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-গতকাল শীর্ষ মহলে যে সিদ্ধান্তকে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে হাততালি দেওয়া হয়েছিল, আজ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নন্দীগ্রামের মেঠো রাজনীতিতে তার উল্টো প্রতিক্রিয়া মিলতে শুরু করেছে। দলীয় নাম-প্রতীক ফ্রিজ হওয়ার পর ধাক্কা সামলাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে নিজের প্রার্থী প্রত্যাহার করে কংগ্রেসের মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন। কিন্তু গতকালের এই হাইপ্রোফাইল ঘোষণার পর আজ সকাল থেকেই নন্দীগ্রামের বুথে বুথে, চায়ের দোকানে ছড়াচ্ছে তীব্র ক্ষোভ ও চরম বিভ্রান্তি। নেতারা কলকাতায় বসে হাত মেলালেও, নন্দীগ্রামের নিচুতলার কর্মীরা এই ‘অস্বাভাবিক রাজনৈতিক রসায়ন’ কতটা মেনে নিতে পারছেন? গ্রাউন্ড জিরো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উঠে আসছে ৩টি বিস্ফোরক বাস্তব চিত্র।

নন্দীগ্রামের মাটিতে তৃণমূলের জন্ম লগ্ন থেকে যে সমস্ত কর্মীরা রক্ত দিয়েছেন, মার খেয়েছেন বা কেস খেয়েছেন, তাঁদের সিংহভাগ লড়াইটাই ছিল সিপিএম এবং স্থানীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। আজ হঠাৎ করে হাইকমান্ডের নির্দেশে তাঁদের বলা হচ্ছে—সব ভুলে কংগ্রেসের ‘হাত’ চিহ্নে ভোট দিতে হবে! বহু পুরনো বুথ কর্মীর কথায় চাপা কান্না ও ক্ষোভ, “আজ যদি কংগ্রেসকে ভোট দিতে হয়, তবে বিগত ২০ বছর ধরে আমরা কার বিরুদ্ধে লড়াই করলাম? আমাদের আত্মত্যাগের দাম কোথায়?” নিচুতলার এই মানসিক টানাপোড়েন ভোটের দিন মমতাপন্থী শিবিরের বুথ ম্যানেজমেন্টে বড়সড় ধস নামাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত নন্দীগ্রামের দেওয়ালে দেওয়ালে মমতাপন্থী প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধানের নাম লেখা হয়েছিল। প্রতীকের জট চলায় কর্মীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে প্রচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু কালকের ঘোষণার পর আজ সকাল থেকেই সেইসব দেওয়াল চুনকাম করে মুছে ফেলার হিড়িক পড়েছে। নতুন করে সেখানে কংগ্রেস প্রার্থীর হয়ে প্রচার করতে গিয়ে নিচুতলার কর্মীরা ব্যাপক অস্বস্তিতে পড়েছেন। সাধারণ ভোটারের দরজায় গিয়ে কোন মুখে কংগ্রেসের ভোট চাওয়া হবে, তা নিয়ে বুথ স্তরের নেতাদের কোনো সদুত্তর নেই।মমতাপন্থী শিবিরের নিচুতলার এই তীব্র অসন্তোষ ও মানসিক ফাটলকে হাতছাড়া করতে রাজি নয় শাসকদল বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গড় হিসেবে পরিচিত নন্দীগ্রামে ইতিমধ্যেই বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্ব সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সূত্রে খবর, তৃণমূলের যে সমস্ত নিষ্ঠাবান কর্মী বা ভোটার কোনো অবস্থাতেই কংগ্রেসের হাত চিহ্নে বোতাম টিপতে রাজি নন, তাঁদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেছে বিজেপি। “নেতারা আপনাদের আবেগ বিক্রি করে দিয়েছে, আপনারা বিজেপিতে চলে আসুন”— এই প্রচার চালিয়ে নিচুতলার ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় থাবা বসানোর ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করছে পদ্ম শিবির।

রাজনীতিতে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতি চিরকালই চলে এসেছে। কিন্তু নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে অতি-স্পর্শকাতর মাটিতে এই নীতি নিচুতলার কর্মীদের আবেগে চরম আঘাত হেনেছে। নেতারা জোটের অঙ্ক কষে ভাবছেন শুভেন্দু-বিরোধী সব ভোট এক বাক্সে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে ক্ষুব্ধ কর্মীদের একটা বড় অংশ যদি ভোটের দিন ঘরে বসে যায় কিংবা ক্ষোভে বিজেপির দিকে পা বাড়ায়, তবে দিদির এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ নন্দীগ্রামের মাটিতেই বুমেরাং হয়ে যাওয়ার নজিরবিহীন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।