প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-শপিং মলে বা ফাইভ স্টার হোটেলে গেলে যারা পকেটে রুমাল চেপে ঘোরেন, অথচ নিজের রাজ্যের রাস্তায় পা রাখলেই বুক ফুলিয়ে যেখানে-সেখানে গুটখার পিক ফেলেন—তাদের সুদিন এবার শেষ। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে খাস বাংলায় শুরু হতে চলেছে এক অভূতপূর্ব পরিচ্ছন্নতা বিপ্লব। রাস্তায় যত্রতত্র আবর্জনা ছড়ালে, প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ ব্যবহার করলে বা পানের পিক ফেললে এবার আর রেহাই নেই। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে এবার কড়া জরিমানা ধার্য করতে চলেছে প্রশাসন। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, স্বভাব বদলানোর এবং নাগরিকদের সচেতন হওয়ার জন্য আগামী ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা সময় দেওয়া হলো। এর পর থেকে আইন কাজ করবে তার নিজের নিয়মে। মন্ত্রী জানান, জরিমানার হার ঠিক কত হবে তা চূড়ান্ত স্তরের আলোচনার পর নির্দিষ্ট করা হবে, তবে মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের বিদ্যমান আইন মোতাবেক কড়া পদক্ষেপ নেওয়া নিশ্চিত। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-এর যে মূল মন্ত্র, এতদিনে যেন তার প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখতে চলেছে এই রাজ্য। আজকের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কিন্তু কোনো সাধারণ ঘোষণা নয়। এটা সাধারণ মানুষের রোজকার নোংরা অভ্যাসের গালে একটা সপাটে চড়। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আয়েশ করে গুটখা চিবিয়ে পিচের ওপর রাঙা পিক ফেলেন, কিংবা বাড়ির প্লাস্টিকের প্যাকেটটা সটান ছুঁড়ে দেন ফুটপাতে—তাহলে সাধু সাবধান! আপনার এই খামখেয়ালিপনা বন্ধ করতে এবার কোমর বেঁধে নামছে প্রশাসন।

বছরের পর বছর ধরে আমরা কী দেখে আসছি? আমাদের এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা! দিল্লির মেট্রোয় উঠলে আমরা ভদ্রবাবু, এয়ারপোর্টে গেলে আমরা আইন মেনে চলা সুনাগরিক। কিন্তু নিজের শহরের রাস্তায় বা নিজের পাড়ার মোড়ে এলেই বুকটা চওড়া হয়ে যায়? যেখানে খুশি থুতু ফেলা, যেখানে খুশি নোংরা ফেলাটাকে আমরা নিজেদের জন্মগত অধিকার ভেবে নিয়েছি! এই মজ্জাগত নোংরা মানসিকতায় এবার কিন্তু চরম কুঠারাঘাত পড়তে চলেছে। প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, সুধরে যাওয়ার জন্য ৩ মাস সময় দেওয়া হলো। এরপরেও যারা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে পুরসভা। কিন্তু প্রশ্ন উঠবে—শুধু জরিমানা করলেই কি শহর পরিষ্কার হয়? সাধারণ মানুষ নোংরা ফেলবে কোথায়? পরিকাঠামো কোথায়?খুব সংগত প্রশ্ন। আর ঠিক এই জায়গাতেই এবার মাস্টারস্ট্রোক দিতে চলেছে দপ্তর। কোনো খোঁড়া অজুহাতের জায়গা রাখা হচ্ছে না। শহর জুড়ে প্রতি ১০০ মিটার অন্তর অন্তর বসানো হচ্ছে আধুনিক ডাস্টবিন। অর্থাৎ, ‘ডাস্টবিন খুঁজে পাইনি তাই রাস্তায় ফেলেছি’—এই চেনা সাফাই দেওয়ার রাস্তা চিরতরে বন্ধ। শুধু তাই নয়, ফাঁকিবাজ কর্মচারীদের টাইট দিতে এবং সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে আনা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি—‘স্বচ্ছ অ্যাপ’ (Swachha App)। আপনার বাড়ির সামনে বা রাস্তার মোড়ে জঞ্জাল জমে আছে? ছবি তুলুন, অ্যাপে আপলোড করুন। ব্যস, আপনার নাগরিক দায়িত্ব শেষ। জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই লোকেশন সরাসরি চলে যাবে পুরসভার কন্ট্রোল রুমে। আর ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক ২ ঘণ্টার মধ্যে সেই আবর্জনা সাফ করার চরম ডেডলাইন দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজ্যের ১০টি পুরসভায় এই পাইলট প্রজেক্ট শুরু হতে চলেছে।

আসল তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় কী জানেন? এই অভিযানে শুধু জরিমানা আর অ্যাপেই ইতি টানা হচ্ছে না। কোপ পড়ছে পরিবেশের আসল শত্রু—একবার ব্যবহারযোগ্য ক্ষতিকারক প্লাস্টিকের ওপরেও। বাজারে বাজারে বসানো হচ্ছে কাপড়ের ব্যাগের স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিন। আর আমাদের মা-বোনেদের দীর্ঘদিনের চরম দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে হাইওয়েতে প্রতি ১০ কিলোমিটারে এবং শহরে প্রতি ২ কিলোমিটারে তৈরি হচ্ছে ঝাঁ-চকচকে মহিলাদের আধুনিক শৌচাগার। আজকে দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্তকে সকলের স্বাগত জানানো উচিত। নিজের শহরকে, নিজের রাজ্যকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্বটা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এটা আপনার আর আমার।

আইন তো কঠোর হচ্ছে, পরিকাঠামোও তৈরি হচ্ছে—কিন্তু আসল প্রশ্নটা কিন্তু অন্য জায়গায়। ১ সেপ্টেম্বর থেকে কি সত্যিই আমূল বদলে যাবে আমাদের পুরোনো মানসিকতা? নাকি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই সনাতন ‘চলছে চলবে’ মার্কা নোংরামি চলতেই থাকবে? নজর থাকবে আমাদের।