প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-আর মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, মালদহ প্রশাসনিক ভবনের অলিন্দে ততই চড়চড় করে বাড়ছে পারদ। উত্তরবঙ্গের আকাশ জুড়ে দুর্যোগের মেঘ, লাগাতার চলছে বৃষ্টি। আবহাওয়ার এই চোখরাঙানিতে মুখ্যমন্ত্রীর চপার ওড়ার পথ বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীকে আটকে রাখা যায়নি। আকাশপথ স্তব্ধ তো কী হয়েছে, ‘পিপলস সিএম’ ট্রেনেই সওয়ার হয়ে ধেয়ে আসছেন মালদহের দিকে। আর মুখ্যমন্ত্রী মালদহ স্টেশন ছোঁয়ার আগেই চার জেলার ঢিলেঢালা আমলাতন্ত্র আর নিষ্ক্রিয় পুলিশকর্তাদের অন্দরে শুরু হয়ে গেছে তীব্র চাঞ্চল্য। মালদহ কলেজ অডিটোরিয়ামে চার জেলার—মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর—এই মেগা প্রশাসনিক বৈঠক শুরু হতে আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা। তবে বৈঠক শুরুর আগের এই থমথমে পরিবেশই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এবারের পর্যালোচনা কতটা কড়া হতে যাচ্ছে প্রশাসনের জন্য।
বিগত জমানার মতো এই প্রশাসনিক বৈঠক শুধুমাত্র এসি ঘরে বসে দামি চা-বিস্কুট খাওয়া আর ক্যামেরার সামনে ‘ফটো-সেশন’ করার প্রথাগত জায়গা নয়। নবান্ন সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই চার জেলার এক-একটি ফাইল খুঁটিয়ে দেখে কড়া হোমওয়ার্ক সেরে টেবিলে বসছেন। টেবিলে সুনির্দিষ্ট খতিয়ান নিয়ে রেডি মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আমজনতার টাকা খরচের গতি কেন মন্থর? কেন আবাস যোজনার ঘর বা গ্রামীণ রাস্তার কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থমকে রইল? কোন আধিকারিকের গাফিলতিতে সরকারি প্রকল্পের গতি ব্যাহত হলো, আজ তার জবাবদিহি করতে হবে শীর্ষ কর্তাদের। এতদিন যারা লাল ফিতের ফাসি পরিয়ে ফাইল আটকে রাখতেন, আজ মুখ্যমন্ত্রী তাদের ফাইল ধরে প্রশ্ন করতে পারেন।
বৈঠক শুরুর আগেই প্রশাসনিক অন্দরের ফিসফাস, আজ কাজের খতিয়ানের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজন কর্তাকে কড়া হুঁশিয়ারির মুখে পড়তে হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান নজর থাকছে মূলত দুটি বড় বিষয়ে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের গতিপ্রকৃতি এবং চোরাচালান রুখতে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা আজ সরাসরি খতিয়ে দেখবেন মুখ্যমন্ত্রী। মালদহ ও মুর্শিদাবাদে গঙ্গা ও ফুলহার নদীর ভাঙন রুখতে বরাদ্দ হওয়া সরকারি অর্থ সঠিক উপায়ে ব্যবহার হয়েছে কিনা এবং সেচ দফতরের কাজের গুণগত মান কেমন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা হবে।
বিগত জমানার বাংলা দেখেছিল এক ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে বিরোধী দলের সাংসদ বা বিধায়কদের প্রায়শই সরকারি বা প্রশাসনিক বৈঠক থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যেত। কিন্তু নতুন মুখ্যমন্ত্রী এসেই সেই দলদাসের সংস্কৃতিকে এক ঝটকায় বদলে দিয়েছেন।আজকের মেগা বৈঠকে বিজেপি জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি সমান মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সহ সমস্ত বিরোধী দলের সাংসদ ও বিধায়কদের। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—রাজনীতি হবে ভোটের মাঠে, কিন্তু মানুষের উন্নয়নের টেবিলে কোনো রঙ দেখা হবে না। বিরোধী শিবিরের জনপ্রতিনিধিদেরও আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন কোনো দ্বিধা না রেখে তাদের এলাকার সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ ও বঞ্চনার কথা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে তুলে ধরেন।
আমলাতন্ত্রের ঢিলেমি বা ফাইল আটকে রেখে সাধারণ মানুষকে ঘোরানোর দিন যে বাংলায় খতম, আজ মালদহের মাটি থেকে সুশাসনের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত প্রমাণ মিলতে যাচ্ছে। সুশাসনের এক নতুন ব্লু-প্রিন্ট সাজাচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে, মুখ্যমন্ত্রী অডিটোরিয়ামে ঢোকা মাত্রই শুরু হবে নজিরবিহীন এই পর্যালোচনা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার শুধু আমজনতার দরবারে কাজের সঠিক হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার পালা।