প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার কলকাতার রাজাবাজারে যে চরম রাজনৈতিক নাটক দেখা গেল, তার রেশ এবার এসে পড়ল ‘মমতা তৃণমূল’-এর অন্দরেই। একদিকে দুপুরে যখন রাজাবাজার মোড়ে পুলিশের কড়া ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে কুণাল ঘোষের মতো নেতারা এবং দলের ছাত্র-যুব কর্মীরা ঘাম ঝরাচ্ছেন, পুলিশের লাঠির মুখে বুক চিতিয়ে লড়ছেন, ঠিক সেই সময়েই দলের আরেক শীর্ষনেত্রী তথা সাংসদ দোলা সেনকে সাথে নিয়ে কালীঘাটের মিলন সংঘের পুজো মণ্ডপে ফিতে কাটতে ব্যস্ত রইলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! আন্দোলনের এমন এক জ্বলন্ত মুহূর্তে নেত্রীর এই ‘পছন্দের নেতাদের নিয়ে উৎসব-যোগ’ এবং রাজাবাজারের মেগা মিছিল এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার খোদ দলের ভেতরেই তীব্র বৈষম্য ও ক্ষোভের চোরাস্রোত তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছে রাজনৈতিক মহল।

রাজাবাজারের ঘটনার পর থেকেই মমতা-শিবিরের অন্দরে চরম অসন্তোষের খবর সামনে আসছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, দলের নিচুতলার কর্মী ও কুণাল শিবিরের অনুগামীরা নেত্রীর এই আচরণে চরম ক্ষুব্ধ। বিরোধীদের তীব্র কটাক্ষ, অতীতে যিনি কর্মীদের একটা ডাক দিলে নিজে সবার আগে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেন, আজ ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তটুকুকে নিয়েই ব্যস্ত। বিজেপি শিবিরের এক শীর্ষ নেতার কড়া খোঁচা, “কুণাল ঘোষদের মতো নেতাদের রাজাবাজারে পুলিশের সামনে কামানের গোলার মতো ঠেলে দিয়ে নিজে প্রিয়পাত্র দোলা সেনকে সাথে নিয়ে কালীঘাটে ঢাক বাজাতে চলে গেলেন নেত্রী! কর্মীরা কেন নিজেদের ক্যারিয়ার নষ্ট করে পুলিশ-কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠি খাবে, যেখানে খোদ দলনেত্রী পুজো উৎসবে মত্ত?” ওয়াকিবহাল মহলের মতে, দলের অভ্যন্তরে নেতাদের এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে দিচ্ছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনায়কতন্ত্র এখন খোদ দলের কর্মীদের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, রাজাবাজারের এই মেগা মিছিল আদতে প্রমাণ করে দিল যে নেত্রীর অনুপস্থিতিতে কুণাল ঘোষদের নেতৃত্ব কতটা দিশাহীন এবং অভিভাবকহীন। পুলিশ মিছিল আটকাতেই যেভাবে ম্যাটাডোরের ওপর দাঁড়িয়ে কুণাল ঘোষরা তড়িঘড়ি দায়সারা ভাষণ দিয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন, তা দেখে স্পষ্ট যে তাঁরাও বুঝতে পেরেছিলেন—নেত্রী যখন নিজে মাঠে নেই, তখন শুধু শুধু রাস্তায় মার খেয়ে লাভ নেই। সমালোচকদের দাবি, বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া আইনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার মতো সাংগঠনিক জোর কুণালদের নেই। নেত্রী নিজে পুজো উদ্বোধনের নিরাপদ মঞ্চ বেছে নেওয়ায়, নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে এই বার্তাই গিয়েছে যে দলে এখন ‘পছন্দের নেতা’ আর ‘বলির পাঁঠা’-দের আলাদা তালিকা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলে যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছিল, রাজাবাজারের এই ফ্লপ শো তা আরও একবার জনসমক্ষে এনে দিল।

রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজাবাজারে কুণালদের একা ফেলে পুজো উদ্বোধন করতে যাওয়ায় দলের ভেতর যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে নজর ঘোরাতেই কি তড়িঘড়ি কালীঘাটের ঘটনাকে হাতিয়ার করা হলো? মিলন সংঘের বাইরে এক মাদকাসক্ত নারীর অসভ্য আচরণকে সাথে সাথে ‘প্রাণঘাতী হামলা’র রূপ দিয়ে ইমেলে এফআইআর (FIR) দায়ের করলেন খোদ দোলা সেন। সমালোচকদের তীব্র আক্রমণ, রাজাবাজারে কর্মীদের লাঠির সামনে ফেলে আসার পাপ ঢাকতেই কি দোলা সেনকে দিয়ে এই হামলার তত্ত্ব খাড়া করে সস্তা সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছে মমতা-শিবির? রাজাবাজারে সংখ্যালঘু এলাকার কর্মীদের আবেগকে ব্যবহার করে কুণালদের রাস্তায় নামানো হলেও, আসল লাইমলাইট ও নিরাপত্তা যে কেবল নেত্রী এবং তাঁর প্রিয় পাত্রীদের জন্যই বরাদ্দ, এই পুজো-যোগই তা প্রমাণ করে দিল। আর এই চরম বৈষম্যের কারণেই এবার দলের অন্দরেই ভাঙনের ঘণ্টাধ্বনি বাজতে শুরু করেছে বলে দাবি করছে বিরোধী শিবির।