প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের ১৮ তম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই তৈরি হলো এক নজিরবিহীন ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে রাজ্যের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, অন্যদিকে ভাঙড়ের কড়া বিরোধী আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। আপাতদৃষ্টিতে দুই ভিন্ন মেরুর এই দুই নেতার মধ্যেকার এক অদৃশ্য রাজনৈতিক সমীকরণ এদিন প্রকাশ্যে চলে এলো খোদ আইনসভার অলিন্দে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে নওশাদ সিদ্দিকী যখনই বিগত বছরগুলির রাজনৈতিক হিংসার ইতিহাস মনে করাচ্ছিলেন, তখনই ট্রেজারি বেঞ্চে বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ শাসক দলের বিধায়কদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে টেবিল চাপড়ে সেই বক্তব্যকে সমর্থন করতে দেখা যায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়েও কেন নওশাদের প্রতিটি শব্দে এভাবে সহমত প্রকাশ করলেন শুভেন্দু অধিকারী? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই স্বতঃস্ফূর্ত টেবিল চাপড়ানোর মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে। ২০২১ সালের পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু অধিকারী যখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক হিংসা ও একাধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এবং তাঁর দলের কর্মীদের ওপরও নেমে এসেছিল সমপরিমাণ অত্যাচার। বিরোধী আসনে থেকে এই দুই নেতাই তৎকালীন সরকারের পুলিশি অতি সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমান্তরালভাবে লড়াই করেছিলেন। এদিন নতুন স্পিকার নির্বাচনের পর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে বলতে উঠে নওশাদ সিদ্দিকী বিগত দিনে ফুরফুরা শরীফ এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচারের খতিয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি প্রকাশ্যেই স্মরণ করান, একসময় তৎকালীন শাসকদলের অত্যাচারে পরিস্থিতি এতটাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল যে কর্মীদের জীবন বাঁচাতে তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। আজ ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস যখন বিরোধী আসনে স্থান পেয়েছে, তখন নওশাদের মুখ থেকে তাদেরই অতীত অত্যাচারের এই বাস্তব চালচিত্র শুনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। বর্তমান বিরোধী দলের সেই স্বৈরাচারী মানসিকতার মুখোশ খোদ একজন বিরোধী বিধায়কের মুখে উন্মোচিত হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী হাসিমুখে টেবিল চাপড়ে সেই সত্যকে স্বাগত জানান।

ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নওশাদ সিদ্দিকী আজ বিরোধী আসনেই অক্ষুণ্ণ রয়েছেন। অথচ, রাজনৈতিক হিংসার অবসান এবং রাজ্যে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমান বিজেপি সরকারের যে মূল লক্ষ্য, নওশাদের তোলা অভিযোগগুলির সঙ্গে তার এক স্বতঃস্ফূর্ত মিল তৈরি হয়েছে। এদিন নওশাদ সিদ্দিকী তাঁর বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা তাপস রায়ের সংসদীয় ও গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসাও করেন। বিধানসভায় সমস্ত ছোট-বড় বিরোধী দলের বিধায়কদের নির্ভয়ে নিজেদের বক্তব্য পেশ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানান।