প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই ফের উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। এবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-র কড়া স্ক্যানারে রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী তথা বিধাননগরের তৃণমূলি রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ সুজিত বসু। পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় আগামী সোমবার তাঁকে সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই হাই-প্রোফাইল তলব ঘাসফুল শিবিরের জন্য স্রেফ অস্বস্তি নয়, রীতিমত বড়সড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজ্যের একের পর এক পুরসভায় টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়ার যে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছিল, তার তদন্তে নেমে বারবার সুজিত বসুর নাম সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের দাবি, কাঁচরাপাড়া ও হালিশহর সহ উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক পুরসভায় নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব খাটানোর যথেষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। এর আগে সুজিতবাবুর শ্রীভূমির বাড়িতে টানা ১৪ ঘণ্টা ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। শুধু তাঁর বাসভবন নয়, মন্ত্রীর অফিস এবং তাঁর ছেলের মালিকানাধীন রেস্তোরাঁতেও হানা দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সেই সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যেই দুর্নীতির গূঢ় রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তের আঁচ কেবল মন্ত্রীর ওপর সীমাবদ্ধ নেই। নিয়োগ দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা কি প্রভাবশালী মহলের হাত ঘুরে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে কোথাও বিনিয়োগ হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিমধ্যেই ইডি আধিকারিকরা জেরা করেছেন সুজিত বসুর স্ত্রী, কন্যা এবং পুত্রকে। বাদ যাননি তাঁর প্রাক্তন জামাইও। সূত্রের খবর, পরিবারের সদস্যদের বয়ানে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। সেই তথ্যের সূত্র ধরেই এবার সরাসরি খোদ মন্ত্রীকে সামনাসামনি বসিয়ে জেরা করতে মরিয়া ইডি। প্রশ্ন উঠছে, পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের জেরেই কি এবার ফাঁস হতে চলেছে নিয়োগের গোপন আদান-প্রদান?
নির্বাচনের ঠিক মুখে যখন শাসক দল জেলা চষে প্রচার চালাচ্ছে, ঠিক তখনই সুজিত বসুর সিজিও যাত্রা দলের অন্দরে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে। বিজেপির দাবি, “তৃণমূলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। নিয়োগ থেকে রেশন—সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষের হক চুরি হয়েছে। আইন আইনের পথেই চলবে।” পাল্টা হিসেবে তৃণমূল এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে তকমা দিলেও, আমজনতার মনে প্রশ্ন— ধোঁয়া যখন বেরোচ্ছে, তখন আগুন নিশ্চয়ই কোথাও লেগেছে। বিধাননগর ও সংলগ্ন এলাকায় সুজিত বসু তৃণমূলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁকে যদি সিজিও কমপ্লেক্সে আটকে রাখা হয় বা কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে এই অঞ্চলে তৃণমূলের নির্বাচনী রণকৌশল যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
সুজিত বসু বরাবরই দাবি করে এসেছেন, তিনি স্বচ্ছ এবং তদন্তে সবরকম সহযোগিতা করবেন। কিন্তু তদন্তকারীদের পাল্টা যুক্তি, বয়ানে অসংগতি থাকলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বিরোধীদের কটাক্ষ, “শ্রীভূমির দুর্গ কি তবে এবার দুর্নীতির বন্যায় ভেসে যাবে?”
সোমবারের সিজিও অভিযানের দিকেই এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে গোটা রাজ্য। এটি কি স্রেফ রুটিন জিজ্ঞাসাবাদ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো পর্দাফাঁস? ভোটের প্রেক্ষাপটে এই তলব নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলকে চরম চাপে ফেলে দিয়েছে। এখন দেখার, সোমবার সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিয়ে সুজিত বসু তদন্তকারীদের সন্তুষ্ট করতে পারেন নাকি অন্য কোনো ‘অপ্রত্যাশিত’ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। বাংলার নজর এখন সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সের দোরগোড়ায়।