প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সরকারি হাসপাতালে নির্দিষ্ট ডিউটি আওয়ার্সের মধ্যে চিকিৎসকদের একাংশের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা বেসরকারি নার্সিংহোমে রোগী দেখার প্রবণতা রুখতে এবার নজিরবিহীন কড়া অবস্থান নিলেন রাজ্যের নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকার চিকিৎসকদের নিয়মিত মোটা মাইনে দেয়। ফলে কর্তব্যে কোনো রকম ফাঁকি বরদাস্ত করা হবে না। এই নতুন নিয়ম ও কড়াকড়ি যদি কারও পছন্দ না হয়, তবে তিনি অনায়াসে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে দিতে পারেন।
কলকাতায় আয়োজিত চিকিৎসক সংগঠনের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মূলত সরকারি পরিকাঠামোয় থেকে এক শ্রেণির চিকিৎসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও সময় চুরির অভ্যাস বন্ধ করাই যে তাঁর প্রধান লক্ষ্য, তা রবিবারের সম্মেলনে মন্ত্রীর আক্রমণাত্মক বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানান, কোনো চিকিৎসক নন-প্র্যাক্টিসিং অ্যালাওয়েন্স (NPA) না নিলে নিজের ডিউটি আওয়ার্সের বাইরে প্র্যাকটিস করতেই পারেন, কিন্তু হাসপাতালের নির্ধারিত ডিউটি চলাকালীন বাইরে সময় দেওয়া অপরাধের শামিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি বেতন নিয়ে কেন সাধারণ রোগীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখা হবে? এর সমাধান হিসেবেই তিনি ‘না পোষালে ইস্তফা’ দেওয়ার চরম নিদান দিয়েছেন।
রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলির পঠনপাঠনের মান বৃদ্ধি এবং সিনিয়র চিকিৎসকদের পরিষেবা নিশ্চিত করতে নয়া নির্দেশিকা জারি করেছেন মন্ত্রী। এখন থেকে অধ্যাপক (Professors), অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরদের সপ্তাহে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত ৯৬ ঘণ্টা হাসপাতালে উপস্থিত থেকে নিজেদের ডিউটি পালন করতে হবে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, সিনিয়র শিক্ষকেরা সপ্তাহে ৩-৪ দিন হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকলে একদিকে যেমন ইন্টার্ন ও ছাত্রছাত্রীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে সাধারণ গরিব রোগীরাও উপযুক্ত চিকিৎসা পান না। এই বেনিয়ম আর চলতে দেওয়া হবে না।
এই কড়া পদক্ষেপের পটভূমি হিসেবে মন্ত্রী তাঁর সাম্প্রতিক এক সারপ্রাইজ ভিজিটের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কয়েকদিন আগে তিনি বারাসত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে আচমকা পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, হাসপাতালের খাতায় ডিউটি থাকা সত্ত্বেও প্রসূতি বিভাগের এক নামী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে সিজারিয়ান অপারেশন করছেন। এই চরম গাফিলতি সামনে আসতেই হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টারকে শোকজ করার পাশাপাশি কড়া বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় স্বাস্থ্য দপ্তরের বহুদিনের পুরোনো শিথিলতা কাটাতে একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সম্প্রতি যোগ্যতা ছাড়া ভুল পদমর্যাদায় থাকা এক প্রভাবশালী চিকিৎসকের কন্যার পদাবনতি (Demotion) ঘটানো এবং তাঁর অতিরিক্ত বেতন সরকারি তহবিলে ফেরত নেওয়ার ঘটনাতেও মন্ত্রীর আপসহীন মনোভাব স্পষ্ট হয়েছিল। রবিবারের অনুষ্ঠান থেকে চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তী করতে এবং ফাঁকিবাজি রুখতে তিনি যে কড়া বার্তা দিলেন, তা রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে দুর্নীতি ও দালালমুক্ত করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত বড় পদক্ষেপ।