প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের আগমনের পর থেকেই কালীঘাটের অন্দরে চরম হতাশা। দল ভেঙে খানখান, ঘাসফুল প্রতীক হাতছাড়া এবং নিজের বাসভবনে ‘হাউস অ্যারেস্ট’ বা গৃহবন্দি থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পরিস্থিতিতে তাঁর শিবিরের কিছু উৎসাহী নেতা ও সমর্থক ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে এক অদ্ভুত তত্ত্ব বাজারে ছেড়েছেন। তাঁরা বলছেন, ১৯৭৭ সালে ক্ষমতা হারিয়েও যেভাবে ইন্দিরা গান্ধী আবার দিল্লির মসনদে ফিরে এসেছিলেন, মমতাও নাকি ঠিক সেভাবেই ঘুরে দাঁড়াবেন। কিন্তু দিল্লির প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে বাংলার রাজনৈতিক পণ্ডিতদের সাফ কথা—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে ‘ইন্দিরা গান্ধী’ হয়ে ওঠা অলীক কল্পনা মাত্র। দুটি ঘটনার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর নির্বাচনে হেরে গেলেও কংগ্রেসের একটা শতাব্দীপ্রাচীন সর্বভারতীয় ঐতিহ্য ও পরিকাঠামো ছিল। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত প্রতিটি গ্রামে কংগ্রেসের ক্যাডার বেস এবং জনভিত্তি রাতারাতি মুছে যায়নি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল মূলত পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক দল। এই দলটির জন্মই হয়েছিল বাম-বিরোধী আবেগকে পুঁজি করে এবং সরকারি ক্ষমতার জোরে। ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির চাপে আজ সেই দলের ভিত ধসে গিয়েছে। আঞ্চলিক দলের ক্ষমতা চলে গেলে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, যা জাতীয় দলের ক্ষেত্রে হয় না।
১৯৭৭ সালে ক্ষমতা হারানোর পর ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু ঘরে বসে থাকেননি। বিহারের বেলছি গ্রামে যখন দলিতদের ওপর অত্যাচার হয়েছিল, তখন বন্যা ও কাদার তোয়াক্কা না করে হাতিতে চেপে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন ইন্দিরা। সেই লড়াকু জেদ আমজনতার ক্ষোভকে থিতিয়ে দিয়ে তাঁকে আবার ‘মাদার ইন্ডিয়া’ বানিয়েছিল। আর আজ? ২০২৬ সালে এসে ক্ষমতা হারানোর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথে নেমে পুলিশের লাঠির মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন না। বদলে তিনি এসি রুমে বসে প্রেস কনফারেন্স বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে ‘অসহায়’ ও ‘গৃহবন্দি’ দাবি করে সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আমজনতা লড়াকু নেতা পছন্দ করে, ঘরে বসে থাকা হতাশ নেতাকে নয়।
১৯৭৭ সালের হারের পর ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করেছিলেন। তিনি ভারতের মানুষের কাছে জরুরি অবস্থার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে ক্ষোভ প্রশমিত করেছিলেন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি—পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনও আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত। তদুপরি, ইন্দিরা গান্ধী সঞ্জয় গান্ধীকে সরিয়ে দলের রাশ অভিজ্ঞ নেতাদের হাতে দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও নিচুতলার কর্মীদের চেয়ে নিজের পরিবারতন্ত্র ও ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আড়াল করতেই বেশি ব্যস্ত, যা দলের পুরনো ও বিশ্বস্ত নেতাদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দলত্যাগকে ত্বরান্বিত করছে।
১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে যে জনতা পার্টির সরকার ছিল, তা ছিল একাধিক বিরোধী দলের খিচুড়ি জোট, যার কোনো নিজস্ব সুসংগঠিত আদর্শ বা ক্যাডার পরিকাঠামো ছিল না। ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১ মাসের মধ্যেই সেই সরকার পড়ে যায়। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং তাদের পেছনে রয়েছে আরএসএস (RSS)-এর মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক পরিকাঠামো। বিজেপির এই বুথ স্তরের ইস্পাতকঠিন সাংগঠনিক শক্তির সামনে কেবল ‘বঞ্চনা’ বা ‘কান্না-কাটির’ রাজনীতি করে জমি পুনরুদ্ধার করা মমতার পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
রাজনীতির ইতিহাসে ক্ষমতার উত্থান-পতন থাকেই। কিন্তু একনায়কতন্ত্রের তকমা মুছে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসার জন্য যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, জাতীয় পরিকাঠামো এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি মাটির যোগাযোগ প্রয়োজন—তার একটাও আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে অবশিষ্ট নেই। নাম হারিয়ে, প্রতীক হারিয়ে এবং নিজের গড় হারিয়ে যে দল এখন অস্তিত্বের সংকটে, তার নেত্রী নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সমকক্ষ ভাবলে তা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে।