প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন এক নজিরবিহীন মোড় নিল। বিধায়কদের সই জালিয়াতি বা রাজনৈতিক মহলে বহুল চর্চিত “সাইনগেট” বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সামনে এলো আরও এক চরম প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংকট। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে স্পিকারের সচিবালয়ে তৃণমূলের পাঠানো নতুন চিঠির আইনি ও সংসদীয় বৈধতা নিয়েই এবার প্রকাশ্য রাজনৈতিক ময়দানে জোরদার প্রশ্ন উঠে গেল। বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী তাপস রায় এই নতুন চিঠির গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সই জালিয়াতির মতো গুরুতর আইনি ধাক্কা এবং অভ্যন্তরীণ ফাটল সামাল দিতে গিয়ে এবার সংসদীয় রীতিনীতিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে ঘাসফুল শিবির। যার জেরে পরিষদীয় দলের অন্দরে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভ ও ভাঙন এখন আরও স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে।
তৃণমূলের অন্দরের এই চরম সমন্বয়হীনতা এবং আইন ভাঙার খেলা এখন রাজ্য রাজনীতির প্রধান চর্চার বিষয়। জানা গিয়েছে, সই জালিয়াতির অভিযোগ ধামাচাপা দিতে বিধানসভার স্পিকারের সচিবালয়ে তড়িঘড়ি একটি নতুন চিঠি পাঠিয়েছে তৃণমূল ভবন। কিন্তু সেই চিঠি ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের চিঠিতে বা পরিষদীয় সভার রেজোলিউশনে দলের সমস্ত জয়ী বিধায়কদের গণস্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ, তৃণমূলের পাঠানো এই নতুন চিঠিতে দলের কোনো বিধায়কের সই বা মতামতের উল্লেখই নেই। বিধায়কদের সই ছাড়াই পাঠানো এই চিঠিতে রয়েছে শুধুমাত্র দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক স্বাক্ষর।
এই চিঠির কোনো আইনি বা সংসদীয় বৈধতা নেই বলে স্পষ্ট দাবি করেছেন বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী তাপস রায়। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, দল চালাতে গিয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব এতটাই মরিয়া যে তারা এখন আইন ও বিধানসভার রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে না। এই অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের জেরেই তৃণমূলের অবস্থা আগামী দিনে মহারাষ্ট্রের মতো হতে চলেছে এবং দলটির ভেঙে চুরমার হওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
বিতর্কের সূত্রপাত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের পর কালীঘাটে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের একটি বৈঠক ডেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম চূড়ান্ত করা হয়। নিয়মমাফিক বিধানসভার অধ্যক্ষের নির্দেশ মেনে যখন সভার রেজোলিউশন বা ‘মিনিটস’ জমা দেওয়া হয়, তখনই সামনে আসে এক বিস্ফোরক তথ্য।দেখা যায়, দলের ১৪ জন বিধায়কের সইয়ের জায়গায় শুধুমাত্র ব্লক লেটারে নাম লেখা রয়েছে, যা আদতে কোনো বৈধ স্বাক্ষর নয়। এই জালিয়াতির পর্দা ফাঁস হতেই দলের অন্দরেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন খোদ তৃণমূলের দুই বিধায়ক— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। তাঁরা স্পষ্ট জানান, তাঁদের অজান্তেই তাঁদের সই জাল করে বিধানসভায় রেজোলিউশন পাঠানো হয়েছে। নিজেদের ঘরের বিধায়কদের এই বিদ্রোহ সামলাতে না পেরে তৃণমূল নেতৃত্ব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই চরম অসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। সই জালের অভিযোগ তোলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দলবিরোধী কার্যকলাপের তকমা দিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু মুখ বন্ধ করার এই মরিয়া চেষ্টা আইনের হাত থেকে তৃণমূলকে বাঁচাতে পারেনি।
বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, খোদ বিধায়কদের করা এই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের (ফোরজারি) তদন্ত করছে রাজ্য পুলিশ এবং সিআইডি (CID)। তদন্তের স্বার্থে এবং সই জালিয়াতির মূল চক্রীকে চিহ্নিত করতে সিআইডি ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নোটিশ পাঠিয়েছে। যেহেতু বিষয়টি এখন সম্পূর্ণ আইন ও আদালতের বিচারাধীন এবং সিআইডি এর তদন্ত করছে, তাই রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের একটি অংশ যতই এই জালিয়াতিকে ‘নিছক ভুল’ বলে চালানোর চেষ্টা করুক না কেন, আইনি দিক থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সইয়ের এই চিঠি যে বিধানসভায় ধোপে টিকবে না, তা নিশ্চিত। বিধায়কদের সই ছাড়া কোনো দলনেতা নির্বাচন করার এই মরিয়া চেষ্টা আসলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ চরম অবিশ্বাসেরই প্রমাণ। আসন্ন বাজেট অধিবেশনের আগে এই “সাইনগেট” কেলেঙ্কারি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অন্দরে তৃণমূল কংগ্রেসকে যে এক চরম লজ্জাজনক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে তৃণমূল শিবিরের একাংশের দাবি, দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এই চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং এর কোনো আইনি ত্রুটি নেই।