প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতা হাতছাড়া হয়েছে মাত্র কিছুদিন হলো, কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবশিষ্টাংশ অহংকার ও ক্ষমতার আস্ফালন যে এখনও মজ্জাগত, তা শনিবার সন্ধ্যায় আরও একবার প্রমাণ করলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার অন্যতম নামী বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউ ক্লিনিকের করিডোরে গতকাল চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি সম্পূর্ণ পেশাদার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাঁর যে রূপ দেখা গেল, তা একপ্রকার নজিরবিহীন। রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন রাজনৈতিক জমানায় ক্ষমতা হারিয়ে খেই হারিয়ে ফেলা তৃণমূল নেতৃত্ব এখন সহানুভূতি কুড়াতে কতটা মরিয়া, এই ঘটনা তারই জীবন্ত দলিল।

সোনারপুরে আমজনতার বিক্ষোভের মুখে পড়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন হাসপাতালে আসেন, তখন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। মেডিকেল বুলেটিন ও ‘এমার্জেন্সি নোট’ স্পষ্ট বলছে—শরীরে কোনো গুরুতর আঘাত নেই, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং তাঁকে ভর্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলায় নতুন রাজনৈতিক যুগ শুরু হলেও, চিকিৎসকদের এই স্বাধীন ও বিজ্ঞানসম্মত রায় যেন মেনে নিতে পারলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাসপাতালের সিইও (CEO) প্রদীপ ট্যান্ডনকে লক্ষ্য করে তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্য, “ট্যান্ডন আপনি ভুল করলেন। ভুলে যাবেন না আপনাদের কত সাহায্য করেছি। ভগবান আপনাকে ক্ষমা করবেন না।”—রাজ্যবাসীকে পুরোনো ‘দাদাগিরি’ ও সিন্ডিকেট রাজের দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

সচেতন নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তুলছেন, একজন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে একটি স্বনামধন্য সংস্থাকে অতীতে করা ‘সাহায্যের’ খোঁটা দিতে পারেন? চিকিৎসকদের পেশাদার সিদ্ধান্ত কি কোনো দলের রাজনৈতিক অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে? অতীতে ক্ষমতার অলিন্দে থাকার সময় কাকে কী সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেই দোহাই পেড়ে ডাক্তারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক। বেলভিউয়ের চিকিৎসকেরা গতকাল কোনো রাজনৈতিক হুমকির কাছে মাথা নত না করে যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা নতুন বাংলার আইনের শাসনেরই প্রতিফলন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের দাবি, সোমবারই (৩১ মে) সিআইডি (CID) দপ্তরে হাজিরার নির্দেশ রয়েছে অভিষেকের। আর তার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে এই ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার’ মরিয়া চেষ্টা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর পুলিশ-প্রশাসনের ‘কবচ’ আর নেই, তাই আইনি তদন্ত থেকে বাঁচতেই কি এই অসুস্থতার তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা হয়েছিল? চিকিৎসকদের সততার কারণে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই কি এই চরম হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ?

বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও তৃণমূল নেত্রী যে এখনও পুরোনো অহংকারের বৃত্তেই বন্দি, তা বেলভিউয়ের এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের সমর্থন ফিরে পাওয়ার বদলে চিকিৎসকদের অভিশাপ দেওয়া বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেওয়া কোনো সুস্থ রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না। ক্ষমতা হারিয়েও এই ধরণের ক্ষমতার আস্ফালনকে বাংলার মানুষ যে আর বরদাস্ত করবে না, তা হয়তো আর কিছুদিনেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।