প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের পুলিশি অ্যাকশন। সেই ঘটনার ফাইল নতুন করে খোলার দাবি জানিয়ে এবার সরাসরি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি পাঠালেন বারাসতের সাংসদ তথা এনসিপিআই (NCPI) নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিন পাতার এই চিঠিতে পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া এবং অপরাধীদের সুরক্ষাকবচ দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন তিনি।
কেটে গিয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়। কিন্তু ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক থামেনি। এবার সেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পুনর্তদন্ত চেয়ে বর্তমান রাজ্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেন তৃণমূলত্যাগী সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে দেওয়া এই চিঠিতে তিনি বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সদিচ্ছা ও ভূমিকা নিয়ে একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তুলেছেন।
চিঠিতে সাংসদ দাবি করেছেন, ২০১১ সালে পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিগত তৃণমূল সরকার আসলে বাম জমানার অপরাধীদের আড়াল করতে এক ‘গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা’র নীতি নিয়ে চলেছিল। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ১৯৯৩ সালের ঘটনার সময় যিনি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন, সেই মণীশ গুপ্তকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। উল্টে পূর্বতন সরকার তাঁকে নির্বাচনে টিকিট দিয়ে মন্ত্রী বানায় এবং পরবর্তীতে রাজ্যসভার সাংসদ পদ দিয়ে পুরস্কৃত করে। এ ছাড়াও লালবাজার এবং মহাকরণ থেকে ২১ জুলাই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ফাইল রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়েও তিনি বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সত্য উদ্ঘাটন এবং শহিদ পরিবারগুলির ন্যায়বিচারের স্বার্থে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ৬ টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। ২১ জুলাইয়ের পুলিশি গুলিবর্ষণের ঘটনাটির ফাইল পুনরায় খুলে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। জ্যোতি বসু সরকারের আমলে যে সমস্ত আমলা ও পুলিশ আধিকারিক এই ঘটনার জন্য দায়ী ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ধারায় ফৌজদারি মামলা রুজু করে চার্জশিট পেশ করতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় গঠিত হওয়া বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের মূল তদন্ত রিপোর্টটি সম্পূর্ণ আকারে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে হবে। অপরাধের সাথে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও যারা বিগত সরকারের আমলে পদোন্নতি বা রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্য জানতে প্রয়োজনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ডেকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফরেনসিক পুনর্তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। চ্যাটার্জি কমিশনের সুপারিশ মেনে গুলিকান্ডে শহিদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য স্থায়ী আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চিঠির ছত্রে ছত্রে কাকলি ঘোষ দস্তিদার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলেও যদি এই ঘটনার প্রকৃত বিচার না মেলে, তবে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই পোক্ত হবে যে তৃণমূল এবং বামফ্রন্টের অপরাধীদের মধ্যে এক গভীর যোগসাজশ ছিল। সম্প্রতি লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দল ভেঙে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জন সাংসদ এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছেন। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ এবং তার পরপরই ২১ জুলাইয়ের ফাইল খোলার এই দাবি রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিল।