প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-দলটার নাম তৃণমূল কংগ্রেস, যেখানে আত্মসম্মান বা নিজস্ব মতাদর্শ নয়—নেতৃত্বের চাটুকারিতা আর ক্ষমতার সমীকরণই শেষ কথা বলে দাবি বিরোধীদের। গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে তৃণমূল শিবিরের অন্দরে যে হাই-ভোল্টেজ নাটকীয় টানাপোড়েন চলল, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে শীর্ষ নেতৃত্বের সমীকরণের সামনে প্রবীণদের কোনো অবস্থান নেই। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে ‘অহংকারী’ ও ‘উদ্ধত’ তকমা দিয়ে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চূড়ান্ত আলটিমেটাম দিয়েও শেষমেশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি খেলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও পদ বাঁচানোর চাপেই প্রবীণ এই সাংসদ শেষ পর্যন্ত সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছেন এবং অভিষেককে নিজের ‘ছেলের মতো’ বলে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছেন।

তৃণমূলের এই অন্দরমহলের কোন্দলকে স্রেফ ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার লড়াই হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ‘স্বাক্ষর জালিয়াতি’ মামলার আইনি লড়াই লড়ছিলেন। কল্যাণবাবুর অভিযোগ ছিল, তিনি দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা আদালতে পড়ে থেকে শুনানি করালেও, তাঁর অজান্তেই রাতারাতি সেই মামলা থেকে তাঁকে সরিয়ে অন্য এক জুনিয়র আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে নিজের দীর্ঘ ৪৫ বছরের আইনি পেশার প্রতি চরম ‘অপমান’ বলে গণ্য করেছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষোভে তিনি নিজেই ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি কারও বেতনভুক কর্মচারী নন এবং অভিষেকের কোনো মামলা আর লড়বেন না। এর পরেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন কল্যাণ। অভিষেককে চরম ‘অহংকারী’ ও ‘উদ্ধত’ বলে আক্রমণ করে তিনি বলেছিলেন, “অভিষেকের ঔদ্ধত্য সব সীমা ছাড়িয়েছে, ও নিজেকে রাজা ভাবছে।” শুধু তাই নয়, সরাসরি তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, “দিদিকে ঠিক করতে হবে ও দল চালাবে নাকি অভিষেককে রাখবে। অভিষেক আমার বস হতে পারে না। ও থাকলে আমি এই দল করব না।”

এদিকে কল্যাণবাবুর এই বিস্ফোরক বয়ানে যখন তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কঙ্কাল পুরোপুরি সামনে চলে আসে, তখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অত্যন্ত কৌশলে সংবাদমাধ্যমের সামনে শান্ত ও পরিণত সেজে অভিষেক বলেন, “কল্যাণদা প্রবীণ, ওঁর আমাকে কটু কথা বলার বা সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার আছে।” তবে রাজনৈতিক মহলের খবর, পর্দার আড়ালে এর পরেই শীর্ষ নেতৃত্ব ও কালীঘাটের তরফ থেকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বড়সড় পদক্ষেপের বার্তা পৌঁছাতেই পিছু হটেন শ্রীরামপুরের সাংসদ—এমনটাই দাবি বিরোধী শিবিরের।

শীর্ষ নেতৃত্বের সেই অদৃশ্য চাপের চাবুক ঘা খেতেই রাতারাতি বদলে গেল কল্যাণের সুর। যে অভিষেককে গতকাল পর্যন্ত ‘অহংকারী’ বলে দল ছাড়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, আজ রাতারাতি সেই অভিষেক ওঁর কাছে ‘ঘরের ছেলে’ হয়ে গেলেন! সম্পূর্ণ ডিগবাজি খেয়ে কল্যাণবাবু এখন বলছেন, “অভিষেক তো আমার ছেলের মতো। ছেলে ভুল করলে পিতা হিসেবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়াই তো প্রবীণদের কাজ।”

তৃণমূলের এই চরম স্ববিরোধী ও নাটকীয় সুর বদল নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছে ভারতীয় জানতা পার্টি (BJP)। বিজেপির দাবি, তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের কোনো আত্মসম্মান বা মেরুদণ্ড অবশিষ্ট নেই। পিসি-ভাইপোর জুটির কাছে পদ আর ক্ষমতার লোভে এরা বারবার নিজেদের নীতি বিক্রি করতে অভ্যস্ত। আজ যে বিদ্রোহের বেলুন কল্যাণবাবু ফুলিয়েছিলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের একটা ধমকেই তা ফুস হয়ে গেল। ভাইপোর কর্তৃত্বের তলাতেই যে প্রবীণদের রাজনীতি করতে হবে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আত্মসমর্পণই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বলে মনে করছে বিজেপি।