প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতা গিয়েছে। নবান্ন হাতছাড়া হয়েছে। অহংকার চূর্ণ হয়েছে। আর ক্ষমতা যেতে না যেতেই এবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল বীরভূম জেলা তৃণমূল।রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে না পেরে দলটির অবস্থা এখন ডুবন্ত জাহাজের মতো। রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচাতে আগেভাগেই পদ ছাড়ার হিড়িক লেগেছে নেতাদের মধ্যে। বীরভূম জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান তথা জেলা কোর কমিটির সভাপতির পদ থেকে একপ্রকার ক্ষোভ উগরে দিয়ে পদত্যাগ করলেন রামপুরহাটের প্রাক্তন বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর টেবিলে পৌঁছে গেছে তাঁর ইস্তফাপত্র।

কিন্তু কেন এই আকস্মিক বৈরাগ্য? কেন এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত? ক্ষমতা ফুরোতেই কি মোহভঙ্গ? কারণটা খুব সোজা। মধু ফুরিয়েছে। রাজত্ব গিয়েছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলার মানুষ তৃণমূলকে বিরোধী আসনে বসিয়েছে। আর ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই চেনা সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরের কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়েছে।বিজেপি বা বিরোধীদের আর কষ্ট করে বীরভূম তৃণমূলের ভেতরের কাদা ঘাঁটতে হচ্ছে না। খোদ আশিস বাবু নিজেই নিজের পদত্যাগপত্রে সেই বিস্ফোরক বোমাটি ফাটিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ—বীরভূম জেলা তৃণমূলের যে ‘কোর কমিটি’, তা আদতে সম্পূর্ণ অকার্যকর! যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা ভূমিকা নেই। ভাবুন একবার! যে দল এতদিন বীরভূমের একছত্র রাজত্বের অহংকার করত, ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী আসনে বসতেই খোদ চেয়ারম্যান বলছেন তাঁদের জেলা কমিটিই আসলে একটা ঠুঁটো জগন্নাথ। আসলে ক্ষমতার অলিন্দে যখন টান পড়ে, তখনই ভেতরের কোন্দল এভাবে প্রকাশ্য রাজপথে চলে আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা আসলে ভাগ-বাঁটোয়ারার লড়াইয়েরই অবশম্ভাবী পরিণতি।

রাজনৈতিক মহল অবশ্য বলছে অন্য কথা। এই ইস্তফা আসলে নির্বাচনী ব্যর্থতার দায় এড়ানোর এবং পিঠ বাঁচানোর এক সুচতুর কৌশল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বীরভূমের মাটিতে ঘাসফুলকে উপড়ে ফেলেছে মানুষ। ২০২১ সালে যে বীরভূমে বিরোধীদের দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, ২০২৬-এ সেখানে ১১টি আসনের মধ্যে ৬ টিই ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। খোদ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের চেনা দুর্গ রামপুরহাটে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছেন।পরাজয়ের এই বিপুল ধাক্কা, নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ আর সবচেয়ে বড় কথা—জনরোষের মুখে পড়ার ভয়। এই ত্র্যহস্পর্শেই কি এখন আগেভাগে পদ ছেড়ে নিরাপদ দূরত্ব খুঁজছেন এই বর্ষীয়ান নেতারা? প্রশ্নটা কিন্তু বীরভূমের হাটে-ঘাটে-মাঠে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এটা কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঠিক দু’দিন আগেই লাভপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অভিজিৎ সিংহ ওরফে রানা এই তথাকথিত কোর কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আজ আশিস বাবু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি রানার সিদ্ধান্তের সাথে একশো শতাংশ সহমত। অর্থাৎ, ফাটলটা কেবল ওপর ওপর নয়, ক্ষমতা হারিয়ে রাজ্যজুড়ে যেভাবে তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন ধরেছে, বীরভূম তৃণমূলের ভিতটাও ঠিক সেভাবেই ধসে গেছে। এখানেই তিনটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন তুলতে হয়। প্রশ্ন নম্বর এক: যে ‘বীরভূম মডেল’ নিয়ে তৃণমূল এতদিন অহংকার করত, দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই মডেল কি এখন শুধুই ডাস্টবিনে? প্রশ্ন নম্বর দুই: ভোটের ভরাডুবির পর কি এখন নিচুতলার কর্মীদের এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে ভয় পাচ্ছেন এই শীর্ষ নেতারা? তাই কি আগেভাগেই নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করছেন? আর প্রশ্ন নম্বর তিন: কোর কমিটির এই অকার্যকারিতা কি আসলে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বীরভূমে তৃণমূলের রাশ এখন আর কারোর হাতে নেই?

দুর্নীতি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ আর ঔদ্ধত্যে জর্জরিত একটা দল যখন সাধারণ মানুষের রায়ে নবান্ন থেকে বিতাড়িত হয়, তখন তার পরিণতি এমনই হয়। কেষ্ট মণ্ডলের সেই ‘চড়াম চড়াম’ ঢাকের আওয়াজ এখন ইতিহাস। বীরভূমের মাটিতে ঘাসফুলের শিকড় যে কতটা আলগা হয়ে গেছে, ক্ষমতা হারানোর পর একের পর এক শীর্ষ নেতার এই ইস্তফাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বীরভূমের আকাশে এখন পরিবর্তনের নতুন সূর্য। আর তৃণমূলের অন্দরে এখন বাজছে শুধুই বিদায়ের সানাই। খেলা কিন্তু সবে শুরু, শেষটা দেখার জন্য চোখ রাখুন আমাদের পোর্টালে।