প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর ক্ষমতা থেকে ছিটকে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ট্র্যাজেডির এখানেই শেষ নয়, আজ বাংলার রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব মহানাটক মঞ্চস্থ হলো, তা পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় ইতিহাসের পাতায় চিরকাল লেখা থাকবে। ক্ষমতার দম্ভ, একনায়কতন্ত্র আর পরিবারতন্ত্রের অহংকার কীভাবে ক্ষমতা হারানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাসের ঘরের মতো চূর্ণ হতে পারে—আজ বিধানসভার অলিন্দে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলল। দিনের পর দিন ধরে দলের ভেতরে যে চরম ক্ষোভের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছিল, আজ তা এক বিরাট রাজনৈতিক অগ্ন্যুৎপাতে পরিণত হলো। কোনো বাইরের শক্তি নয়, ঘরের জনপ্রতিনিধিরাই আজ কালীঘাটের রাজপ্রাসাদের ভিত পুরোপুরি নাড়িয়ে দিলেন। বিরোধী আসনে বসার পরেই পিসী-ভাইপোর সাজানো ক্ষমতার সংসার আজ এক ধাক্কায় তছনছ হয়ে গেল।
গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তিবিশেষের পৈতৃক সম্পত্তি বা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলে না, গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত চলে সংখ্যার জোরে। আর আজ সেই সংখ্যার অকাট্য ম্যাজিক ফিগার বুক পকেটে নিয়ে বিধানসভায় পা রাখলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ থেকে ৬০ জন বিধায়কের সই সংবলিত চিঠি যখন অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বোসের কাছে জমা পড়ল, তখন পিসি-ভাইপোর অনুগামী শিবিরের শীর্ষ নেতাদের মুখের রং চট চট করে বদলাতে শুরু করেছে। দলবিরোধী কাজের তকমা দিয়ে যাঁদের একসময় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার অহংকার দেখানো হয়েছিল, আজ তাঁরাই দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ককে সাথে নিয়ে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিলেন—”আমরাই আসল তৃণমূল!” দলের মনোনীত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে ঋতব্রতবাবুকে ‘বিরোধী দলনেতা’ করার এই প্রকাশ্য দাবি আসলে এতদিনের একনায়কতন্ত্রের গালে এক বিরাট চড়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গণ-বিদ্রোহ অনিবার্য ছিল। নির্বাচনী হারের পরেও আদি ও নিষ্ঠাবান নেতাদের কোণঠাসা করে রাখা, তাঁদের মতামতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভাইপোর তল্পিবাহকদের মাথায় চড়ানো—এই তীব্র অপমান আর কতদিন সহ্য করতেন আত্মসম্মান থাকা জনপ্রতিনিধিরা? শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম দলনেতা হিসেবে প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যে “সই জাল”-এর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল, আজ এই ঐতিহাসিক বিদ্রোহের পর তা বাংলার মানুষের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। ক্ষমতার অলিন্দে বসে এতদিন যাঁরা ভাবতেন গোটা রাজ্যটাই তাঁদের পকেটে, আজ এই ৫৮ জন বিধায়ক তাঁদের আসল আয়নাটা দেখিয়ে দিলেন।আইনি দিক থেকেও ঋতব্রত বাবুদের এই চাল অত্যন্ত নিখুঁত এবং সুপরিকল্পিত।
দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক একসাথে সরব হওয়ায় দলত্যাগ বিরোধী আইন এখানে কার্যকর করা অসম্ভব। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে বা ভয় দেখিয়ে এই ক্ষোভের স্বরকে স্তব্ধ করার ক্ষমতাও আর পিসি-ভাইপোর হাতে নেই। আপাতত বল অধ্যক্ষের কোর্টে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক মহলের মতে, তোলাবাজি আর দুর্নীতির যে সাম্রাজ্য তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল, ক্ষমতা হারানোর সাথে সাথেই আজ তার পতন চূড়ান্ত রূপ নিল। অহংকারের অবসান ঘটিয়ে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন, মার্জিত ভোরের সূচনা হতে চলেছে।