প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর এমনিতেই বাংলার মসনদ হারিয়ে বিরোধী আসনে গিয়ে বসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ক্ষমতা যাওয়ার ধাক্কা সামলানোর আগেই এবার ঘরের কোন্দল এমন জায়গায় পৌঁছাল, যা দেখে রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট ইঙ্গিত— এবার কি তবে ঘাসফুল শিবিরের সলিল সমাধি আসন্ন? সোমবার রাতে কলকাতার এমএলএ হস্টেলে যে চরম ড্রামা মঞ্চস্থ হলো, তা পরাজিত তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! বিধানসভায় তথাকথিত সই-জাল বা সিগনেচার মিসম্যাচ বিতর্কের জেরে তড়িঘড়ি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল উলুবেড়িয়া পূর্বের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির সন্দীপন সাহাকে। কিন্তু ‘দাদাগিরি’ দেখিয়ে মুখ বাঁচানোর ২৪ ঘণ্টাও কাটল না, তার আগেই বহিষ্কৃত সেই দুই নেতার ডেরায় গিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক সেরে এলেন তৃণমূলের বর্তমান দুই বিধায়ক জাভেদ খান ও শিউলি সাহা! ক্ষমতার বাইরে যেতেই দলীয় অনুশাসনের বেলুন যে এভাবে ফুটো হয়ে যাবে, তা বোধহয় কালীঘাট কল্পনা করতে পারেনি।

বিজেপির কাছে গোহারান হেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তৃণমূলের অন্দরে যে চরম দিশাহীনতা তৈরি হয়েছে, এই নৈশ বৈঠক তারই সবথেকে বড় প্রমাণ। রাজনৈতিক মহলের একাংশ তীব্র খোঁচা দিয়ে বলছেন, দলবিরোধী কাজের জুজু দেখিয়ে ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করে শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের যে ‘দাপট’ দেখাতে চেয়েছিল, বর্তমান বিধায়করাই তা ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। যে নেতাদের অস্পৃশ্য ঘোষণা করল দল, তাঁদের সঙ্গেই যখন জাভেদ খান বা শিউলি সাহার মতো প্রবীণ মুখেরা রাতের অন্ধকারে গোপন বৈঠক করছেন, তখন এটা স্পষ্ট যে— পিসি-ভাইপোর ফরমানকে এখন দলের বিধায়করাই আর পাত্তাই দিচ্ছেন না! ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর দলের একটা বড় অংশ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এখন থেকেই তৃণমূলের বিকল্প এবং নতুন কোনো অক্ষ তৈরির খোঁজে নেমে পড়েছেন।আইনি ও পদ্ধতিগত দিক থেকে তৃণমূল এই দুজনকে বহিষ্কারের চিঠি ধরালেও, কারিগরি দিক থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা এখনও বিধানসভার সদস্য। ফলে আইনগতভাবে তাঁদের অবস্থান সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। এই আইনি রক্ষাকবচকে ঢাল করেই বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা সংবাদমাধ্যমের সামনে কার্যত বোমা ফাটিয়ে বলেছেন, “যেখানে অনৈতিক কাজ হচ্ছে, সেখানে কথা বলার জায়গা নেই”। এই একটি মন্তব্যই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, পরাজিত ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে গণতন্ত্রের নামে আসলে কী চলে! আইনজীবীদের একাংশের মতে, এই আইনি ফাঁকফোকরের সুবিধা নিয়েই অসন্তুষ্ট বিধায়করা একজোট হচ্ছেন, যার জেরে আইনি বা সাংবিধানিক কোনো পদক্ষেপ করার ক্ষমতা আপাতত তৃণমূলের হাতছাড়া।

রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার যখন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করে রাজদণ্ড হাতে শাসনকাজ শুরু করে দিয়েছে, তখন বিরোধী শিবিরের এই চরম কোন্দল এবং আড়াআড়ি বিভাজন তাদের আরও ব্যাকফুটে ঠেলে দিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর তৃণমূলের ভাঁড়ার এবং ক্ষমতা দুই-ই শূন্য। এই পরিস্থিতিতে দলের ক্ষুব্ধ বিধায়করা যদি এমএলএ হস্টেলকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠী তৈরি করেন, তবে অবাক হওয়ার কিচ্ছু থাকবে না।আপাতদৃষ্টিতে এই বৈঠককে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার একটা মরিয়া চেষ্টা তৃণমূলের পক্ষ থেকে করা হতেই পারে। তবে রাজনীতির ময়দানে কেউ যে অকারণে রাতের অন্ধকারে বহিষ্কৃতদের ডেরায় গিয়ে হাজিরা দেন না, তা দুধের শিশুও বোঝে। সই-বিতর্কের জল যেভাবে এখন ঘরের আগুনে রূপ নিয়েছে, তাতে ক্ষমতা হারানো তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব যে অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।