প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বীরভূমের পাথর ও বালি মাফিয়া রাজের অলীক সাম্রাজ্য আজ যেভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তা এই বাংলার চোর-পুলিশ খেলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। পলাতক ব্যবসায়ী তথা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ নেতা টুলু মণ্ডলের (Tulu Mondal) আত্মীয়ের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা এবং কেজি কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় এবার চরম নাটকীয় মোড়। বীরভূম জেলা পুলিশের দায়ের করা এফআইআর (FIR) এবং মামলার সমস্ত গোপন নথি এবার সরাসরি তলব করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। সূত্রের খবর, প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে ইতিমধ্যেই এই বিপুল দুর্নীতির প্রেক্ষিতে একটি ইসিআইআর (ECIR) বা এনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট দায়ের করে আর্থিক তছরুপের সমান্তরাল তদন্তে নামছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩০ জুলাই, যখন মহম্মদবাজার এলাকায় টুলু মণ্ডলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তথা ম্যানেজার মিনার মণ্ডলের ডেরায় আচমকা হানা দেয় বীরভূম জেলা পুলিশ। সেই ভাঙাচোরা বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ২৮ কোটি ৫ লক্ষ টাকার নগদ নোটের পাহাড় এবং প্রায় ২১ কোটি টাকা মূল্যের ১৫ কেজি সোনার বাট ও গয়না! সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার এই কুবেরের ধন উদ্ধারের পরই জেলা পুলিশ কোমর বেঁধে তদন্তে নামে।
প্রশ্ন উঠছে, একজন পাথর ব্যবসায়ীর ম্যানেজার বা আত্মীয়ের ঘরে এত কোটি টাকা কীভাবে অবলীলায় গচ্ছিত থাকে? প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, গত ১০ বছরে পাথর ও বালি পাচারের সিন্ডিকেট রাজের মাধ্যমে কয়েকশো কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই এই কালো টাকার উৎস। হাওয়ালার জাল এবং ‘প্রভাবশালী’ যোগের গন্ধকেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (ED)-র গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুমান, এই ৫০ কোটি টাকার নগদ ও সোনা আসলে এক বিশাল হিমশৈলের দৃশ্যমান অংশমাত্র। টুলু মণ্ডলের নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখে ইতিমধ্যেই তাঁর একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, দুটি পেট্রল পাম্প এবং কয়েকশো বিঘা বেনামি জমির নথি ফ্রিজ করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, বিগত জমানার এক ‘প্রভাবশালী’ তৃণমূল নেতা, তাঁর এক বিশেষ সহায়ক এবং এক প্রভাবশালী আইনজীবীর হাত ঘুরে এই কালো টাকার একাংশ হাওলা মারফত সরাসরি বিদেশে পাচার হয়েছে। দুবাই ও তুরস্কের মতো দেশে এই বেআইনি টাকা দিয়ে বিপুল সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলেও অনুমান করা হচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই, যেহেতু বিষয়টির সাথে ‘মানি লন্ডারিং’ বা আন্তর্জাতিক আর্থিক তছরুপের যোগসূত্র রয়েছে, তাই জেলা পুলিশের এক্তিয়ার পেরিয়ে ইডি এখন এই মামলার রাশ নিজের হাতে নিতে চাইছে।
বীরভূম জেলা পুলিশ ইতিমধ্যেই টুলুর ম্যানেজার সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। কিন্তু ইডি ময়দানে নামতেই এই মামলার রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেল। পুলিশি এফআইআর এবং বাজেয়াপ্ত নথির পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য খতিয়ে দেখে খুব শীঘ্রই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা টুলু মণ্ডলের দেশ-বিদেশের সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বেনামি সম্পত্তির ওপর চূড়ান্ত আইনি সিলমোহর বসাতে চলেছে। বাংলার সাধারণ মানুষ বিগত কয়েক বছরে একের পর এক নেতার বাড়ি থেকে টাকার পাহাড় বেরোতে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। তবে টুলু মণ্ডলের এই কুবেরের ধন এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা প্রভাবশালীদের নাম শেষ পর্যন্ত কার কার ঘুম কেড়ে নেয়, সেটাই দেখার। ইডির এই এন্ট্রি কি সত্যিই রাঘববোয়ালদের খাঁচায় পুরবে, নাকি স্রেফ নথির স্তূপের আড়ালেই ফাইল বন্দি হয়ে থাকবে—তার উত্তর দেবে সময়।